জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ১৯৮২ | মহাদেবী বর্মা | হিন্দি | (যামা - বিশেষ উল্লেখে) |



 জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ১৯৮২ | মহাদেবী বর্মা | হিন্দি | সার্বিক অবদান (যামা - বিশেষ উল্লেখে) |

মহাদেবী বর্মা (১৯০৭–১৯৮৭) আধুনিক হিন্দি সাহিত্যের অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র। তাকে হিন্দি সাহিত্যের 'আধুনিক মীরা' বলা হয়। তিনি একাধারে কবি, সমাজকর্মী এবং শিক্ষাবিদ ছিলেন।

হিন্দি সাহিত্যের 'ছায়াবাদ' (Chhayavad) যুগের চার স্তম্ভের অন্যতম একজন হিসেবে তিনি স্বীকৃত। তাঁর জীবন ও সাহিত্যকর্ম সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিচে দেওয়া হলো:


প্রধান পরিচয় ও অবদান

  • জন্ম: ২৬ মার্চ ১৯০৭, উত্তরপ্রদেশের ফারুখাবাদে।

  • শিক্ষা: এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সংস্কৃতে এমএ (MA) ডিগ্রি লাভ করেন।

  • পেশা: তিনি প্রয়াগ মহিলা বিদ্যাপীঠের উপাচার্য হিসেবে দীর্ঘকাল দায়িত্ব পালন করেছেন।

উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্ম

মহাদেবী বর্মার লেখনীতে বেদনা, আধ্যাত্মিকতা এবং প্রকৃতির গভীর ছোঁয়া পাওয়া যায়।

  1. কাব্যগ্রন্থ: 'নীহার', 'রশ্মি', 'নীরজা', 'সান্ধ্যগীত' এবং 'দীপশিখা'।

  2. গদ্য সংকলন: 'অতীত কে চলচ্চিত্র' (Ateet Ke Chalchitra) এবং 'স্মৃতি কি রেখায়েঁ' (Smriti Ki Rekhayen)। এই বইগুলোতে তিনি সমাজের অবহেলিত মানুষের কথা দরদ দিয়ে ফুটিয়ে তুলেছেন।

  3. গল্প: তাঁর বিখ্যাত একটি গল্পের নাম 'গিলু' (একটি কাঠবেড়ালির কাহিনী), যা আজও পাঠকদের মন ছুঁয়ে যায়।

প্রাপ্ত পুরস্কার ও সম্মাননা

তিনি সাহিত্য জগতের সর্বোচ্চ সম্মানগুলোতে ভূষিত হয়েছেন:

  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার (১৯৮২): তাঁর কাব্য সংকলন 'যামা' (Yama)-র জন্য।

  • পদ্মভূষণ (১৯৫৬) এবং পদ্মবিভূষণ (১৯৮৮)।


"আমি এমন এক প্রদীপ হতে চাই যা অন্ধকার পথে আলো ছড়ায়, কিন্তু নিজেকে পুড়িয়ে নিঃশেষ করে দেয়।" — তাঁর দর্শনের একটি মূল ভাবনা।

মহাদেবী বর্মা কেবল ব্যক্তিগত বিরহ বা বেদনার কবি ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন নারীবাদী চেতনার অগ্রদূত এবং প্রাণীদের প্রতি অত্যন্ত মমত্বশীল একজন মানুষ।

মহাদেবী বর্মার সার্বিক অবদান কেবল হিন্দি সাহিত্যের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়; তিনি সমাজ সংস্কার, নারী শিক্ষা এবং গদ্য সাহিত্যেও এক অনন্য ছাপ রেখে গেছেন। তাঁর বহুমুখী প্রতিভার মূল দিকগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:


১. সাহিত্যিক অবদান: ছায়াবাদের স্তম্ভ

হিন্দি সাহিত্যের 'ছায়াবাদ' (রোমান্টিকতাবাদ) আন্দোলনের চারজন প্রধান কবির মধ্যে তিনি অন্যতম। তাঁর কবিতায় রহস্যবাদ এবং বেদনা এক অনন্য উচ্চতা পেয়েছে।

  • আধুনিক মীরা: মীরাবাঈয়ের মতো তাঁর কবিতাতেও এক পরম সত্তার প্রতি বিরহ ও সমর্পণের সুর পাওয়া যায়।

  • যামা (Yama): এটি তাঁর শ্রেষ্ঠ কাব্য সংকলন, যেখানে তাঁর দর্শন ও কাব্য প্রতিভার চরম উৎকর্ষ দেখা যায়।

২. গদ্য সাহিত্যে নতুন ধারা (রেখাচিত্র)

কবিতার বাইরে মহাদেবী বর্মা হিন্দি গদ্যকে এক নতুন রূপ দিয়েছিলেন। তাঁর 'রেখাচিত্র' (Sketches) বা স্মৃতিকথাগুলো অত্যন্ত শক্তিশালী।

  • মানবিকতা: 'গিলু' (কাঠবেড়ালি), 'গৌরা' (গাভী) বা 'নীলকণ্ঠ' (ময়ূর)-এর মতো রচনার মাধ্যমে তিনি পশু-পাখির প্রতি যে মমতা দেখিয়েছেন, তা বিশ্বসাহিত্যে বিরল।

  • অবহেলিতদের কণ্ঠস্বর: 'অতীত কে চলচ্চিত্র' বইতে তিনি সমাজের তথাকথিত নিচু তলার মানুষের (যেমন- ভৃত্য, দুঃখী বিধবা বা অনাথ শিশু) জীবনকে পরম মমতায় ফুটিয়ে তুলেছেন।

৩. নারী জাগরণ ও শিক্ষা

মহাদেবী বর্মা কেবল কলম ধরেননি, নারীর সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন:

  • প্রয়াগ মহিলা বিদ্যাপীঠ: তিনি এই প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘকালীন অধ্যক্ষ ও উপাচার্য ছিলেন, যেখানে তিনি নারীদের উচ্চশিক্ষার পথ প্রশস্ত করেন।

  • শৃঙ্খল কী কড়িয়াঁ (Links in the Chain): এই নিবন্ধ সংকলনে তিনি ভারতীয় নারীদের পরাধীনতা, সামাজিক বৈষম্য এবং তাদের অধিকার নিয়ে জোরালো সওয়াল করেছেন। একে হিন্দি সাহিত্যের অন্যতম সেরা নারীবাদী লেখা হিসেবে গণ্য করা হয়।

৪. শিল্পকলা ও অঙ্কন

খুব কম মানুষই জানেন যে মহাদেবী বর্মা একজন দক্ষ চিত্রশিল্পীও ছিলেন। তাঁর অনেক কাব্যগ্রন্থের প্রচ্ছদ এবং ভেতরের অলংকরণ তিনি নিজেই করতেন। তাঁর আঁকা চিত্রগুলোতেও কবিতার মতোই এক ধরণের মরমী ভাব ফুটে উঠত।


৫. রাজনৈতিক ও সামাজিক সচেতনতা

ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় তিনি মহাত্মা গান্ধীর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। তিনি খাদি পোশাক পরতেন এবং আজীবন দেশি পণ্যের প্রচার করেছেন। উত্তরপ্রদেশ বিধান পরিষদের সদস্য হিসেবেও তিনি গঠনমূলক ভূমিকা পালন করেছেন।

সংক্ষেপে: মহাদেবী বর্মা ছিলেন একাধারে করুণার মূর্ত প্রতীক এবং বিদ্রোহী কলম। তিনি সাহিত্যে যেমন অতীন্দ্রিয় জগতের কথা বলেছেন, গদ্যে তেমনই কঠিন বাস্তবের মাটিতে দাঁড়িয়ে লড়াই করেছেন।

মহাদেবী বর্মার 'শৃঙ্খল কী কড়িয়াঁ' (Chain's Links) কেবল একটি প্রবন্ধ সংকলন নয়, এটি ভারতীয় নারীবাদের ইতিহাসে একটি মাইলফলক। ১৯৪২ সালে প্রকাশিত এই বইটিতে তিনি তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজে নারীর অবস্থানকে অত্যন্ত তীক্ষ্ণ এবং যৌক্তিকভাবে বিশ্লেষণ করেছেন।

এই বইটিতে নারীর অধিকার নিয়ে তাঁর প্রধান মতামতগুলো ছিল নিম্নরূপ:

১. অর্থনৈতিক স্বাধীনতা

মহাদেবী বর্মা বিশ্বাস করতেন, নারীদের পরাধীনতার মূল কারণ হলো আর্থিক পরনির্ভরশীলতা। তাঁর মতে, যতক্ষণ একজন নারী নিজের ভরণপোষণের জন্য বাবা, স্বামী বা ছেলের ওপর নির্ভরশীল থাকবে, ততক্ষণ সে প্রকৃত স্বাধীনতা পাবে না। তিনি নারীর সম্পত্তির অধিকার এবং স্বনির্ভরতার ওপর জোর দিয়েছিলেন।

২. ঘরোয়া দাসত্ব ও 'আদর্শ নারী'র মিথ

তিনি সমাজের তৈরি করা 'আদর্শ নারী' বা 'দেবী' ইমেজের সমালোচনা করেছেন। তিনি মনে করতেন, নারীকে 'দেবী' বানিয়ে উচ্চ আসনে বসানো আসলে তাকে ঘরের চার দেয়ালে বন্দী রাখার একটা কৌশল মাত্র। তাঁর মতে, নারীর প্রথম পরিচয় হওয়া উচিত একজন 'মানুষ' হিসেবে, কারও স্ত্রী বা মাতা হিসেবে নয়।

৩. বিবাহ ও সামাজিক প্রথা

  • অসম বিবাহ: তিনি বাল্যবিবাহ এবং বয়স্ক পুরুষের সাথে অল্পবয়সী মেয়ের বিয়ের তীব্র বিরোধী ছিলেন।

  • যৌতুক প্রথা: যৌতুককে তিনি সমাজের একটি কুৎসিত ব্যাধি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন যা নারীকে একটি 'পণ্যে' রূপান্তর করে।

  • বিধবা বিবাহ: বিধবাদের করুণ দশা দূর করতে তিনি সমাজকে আরও উদার হওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন।

৪. শিক্ষা ও সচেতনতা

তিনি মনে করতেন, শিক্ষা মানে কেবল অক্ষরজ্ঞান নয়, বরং শিক্ষা হলো নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হওয়া। নারীরা যাতে পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে নিজের স্বকীয়তা বজায় রাখতে পারে, সেই শিক্ষাই ছিল তাঁর কাম্য।

৫. মানসিক দাসত্ব থেকে মুক্তি

বইটির একটি বড় অংশ জুড়ে তিনি আলোচনা করেছেন যে, নারীরা অনেক সময় নিজেদের ওপর হওয়া অন্যায়কে 'ভাগ্য' বা 'ধর্ম' বলে মেনে নেয়। এই মানসিক দাসত্ব থেকে বেরিয়ে আসার জন্য তিনি নারীদের সাহসী হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।


সংক্ষেপে: মহাদেবী বর্মা এই বইটির মাধ্যমে বলতে চেয়েছেন যে, নারীর পায়ে পরানো অদৃশ্য শৃঙ্খলগুলো (সামাজিক কুসংস্কার ও নিয়ম) সমাজ ভাঙবে না, বরং নারীকেই নিজের শক্তিতে সেই শৃঙ্খল ছিঁড়তে হবে।

পড়ার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ।। ভালো লাগলে  অবশ্যই লাইক শেয়ার করুন।।লেখক : আব্দুল মুসরেফ খাঁন email :lib.pbc@gmail.com





  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার -১৯৭০ - বিশ্বনাথ সত্যনারায়ণ - তেলুগু - রামায়ণ কল্পবৃক্ষমু 
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার - ১৯৭১ -বিষ্ণু দে -বাংলা- স্মৃতি সত্তা ভবিষ্যত 
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার - ১৯৭২ -রামধারী সিং 'দিনকর' - হিন্দি - উর্বশী  
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার -১৯৭৩- ডি আর বেন্দ্রে এবং গোপীনাথ মোহান্তি - কন্নড়/ওড়িয়া - নাকুতান্তি / মাটিমাতাল 
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার - ১৯৭৪ - বিষ্ণু সখারাম খান্দেকর - মারাঠি -যযাতি
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার -১৯৭৫ - পি ভি আকিলান - তামিল - চিত্রাপ্পাবাই 
  • মালয়ালম কবি জি শঙ্কর কুরুপ 
  • কথাসাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস 'গণদেবতা'-
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার যৌথভাবে দুজন সাহিত্যিককে প্রদান করা হয়েছিল—কন্নড় কবি কে. ভি. পুত্তাপ্পা (কুভেম্পু) এবং গুজরাতি কবি উমাশঙ্কর যোশী।
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার -১৯৬৮ - সুমিত্রানন্দন পন্ত - হিন্দি -চিদাম্বরা 
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার  -১৯৬৯ - ফিরাক গোরখপুরী - উর্দু - গুল-এ-নগমা
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার -১৯৭০ - বিশ্বনাথ সত্যনারায়ণ - তেলুগু - রামায়ণ কল্পবৃক্ষমু 
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার - ১৯৭৬ - আশাপূর্ণা দেবী- বাংলা - প্রথম প্রতিশ্রুতি 
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ১৯৭৭ | কে শিবরাম করন্থ | কন্নড় | মুকাজ্জিয়া কনসুগলু |
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ১৯৭৮ | এস এইচ ভি বাৎসায়ন | হিন্দি | কিতনি নাও মে কিতনি বার |
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ১৯৭৯ | বীরেন্দ্র কুমার ভট্টাচার্য | অসমীয়া | মৃত্যুঞ্জয় |
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ১৯৮০ | এস কে পোট্টেক্কাট | মালয়ালম | ওরু দেশথিন্তে কথা |
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ১৯৮১ | অমৃতা প্রীতম | পাঞ্জাবি | কাগজ তে ক্যানভাস |
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ১৯৮২ | মহাদেবী বর্মা | হিন্দি | সার্বিক অবদান (যামা - বিশেষ উল্লেখে) |
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ১৯৯১ | সুভাষ মুখোপাধ্যায় | বাংলা 
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ১৯৯৬ | মহাশ্বেতা দেবী | বাংলা 
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ১৯৯৯ | নির্মল ভার্মা এবং গুরুদয়াল সিং | হিন্দি/পাঞ্জাবি
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ২০০৫ | কুনওয়ার নারায়ণ | হিন্দি 
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ২০১০ | চন্দ্রশেখর কাম্বার | কন্নড় 
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ২০১৬ | শঙ্খ ঘোষ | বাংলা 
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ২০১৮ | অমিতাভ ঘোষ | ইংরেজি 
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ২০১৯ | আক্কিথাম নাম্বুথিরি | মালয়ালম 
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ২০২১ | নীলমণি ফুকন | অসমীয়া 
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ২০২২ | দামোদর মৌজো | কোঙ্কানি 
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ২০২৩ | গুলজার এবং জগদ্গুরু রামভদ্রাচার্য | উর্দু/সংস্কৃত 
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ২০২৪ | বিনোদ কুমার শুক্ল | হিন্দি 

Post a Comment

0 Comments