জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ২০১৬ | শঙ্খ ঘোষ | বাংলা
আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি এবং প্রথিতযশা সমালোচক শঙ্খ ঘোষ (১৯৩২–২০২১)। রবীন্দ্রোত্তর যুগের বাংলা কবিতায় তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। তিনি শুধু একজন কবিই ছিলেন না, বরং সামাজিক অন্যায় ও শোষণের বিরুদ্ধে এক বলিষ্ঠ এবং সংবেদনশীল কণ্ঠস্বর হিসেবে সমাদৃত।
শঙ্খ ঘোষ সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিচে দেওয়া হলো:
১. সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
আসল নাম: চিত্তপ্রিয় ঘোষ।
জন্ম: ৫ ফেব্রুয়ারি, ১৯৩২ (চাঁদপুর, বর্তমান বাংলাদেশ)।
মৃত্যু: ২১ এপ্রিল, ২০২১ (কলকাতা)।
পেশা: তিনি পেশায় ছিলেন একজন অধ্যাপক। বঙ্গবাসী কলেজ, সিটি কলেজ এবং যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘকাল অধ্যাপনা করেছেন।
২. কাব্যশৈলী ও চেতনা
শঙ্খ ঘোষের কবিতা মূলত অল্প কথায় গভীর ব্যঞ্জনা সৃষ্টির জন্য পরিচিত। তাঁর লেখনীতে মেদহীন ভাষাবিন্যাস এবং তীব্র জীবনবোধ ফুটে ওঠে। তিনি একদিকে যেমন ব্যক্তিগত আবেগ-অনুভূতি নিয়ে লিখেছেন, অন্যদিকে দেশ ও সমাজের অস্থিরতা নিয়েও ছিলেন উচ্চকণ্ঠ।
৩. উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ
তাঁর অসংখ্য রচনার মধ্যে কয়েকটি কালজয়ী গ্রন্থ হলো:
দিনগুলি রাতগুলি (প্রথম কাব্যগ্রন্থ)
বাবরের প্রার্থনা
মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে
পাজরে দাঁড়ের শব্দ
জলই পাষাণ হয়ে আছে
৪. গদ্য ও সমালোচনা
রবীন্দ্র গবেষণায় শঙ্খ ঘোষ এক অনন্য নাম। তাঁর 'ওকাম্পোর রবীন্দ্রনাথ' বা **'নির্মাণ আর সৃষ্টি'**র মতো বইগুলো বাংলা সাহিত্যের সম্পদ। শিশুদের জন্যও তিনি চমৎকার সব ছড়া ও গদ্য লিখেছেন।
৫. পুরস্কার ও সম্মাননা
সাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য তিনি দেশ-বিদেশের বহু সম্মানে ভূষিত হয়েছেন:
জ্ঞানপীঠ পুরস্কার (২০১৬) - ভারতের সর্বোচ্চ সাহিত্য সম্মান।
সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার (১৯৭৭) - বাবরের প্রার্থনা কাব্যগ্রন্থের জন্য।
পদ্মভূষণ (২০১১)।
দেশিকোত্তম (বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়)।
"আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি..." — তাঁর এই বিখ্যাত পঙ্ক্তিটি আজও মানুষের একাত্মবোধ ও প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে আছে।
শঙ্খ ঘোষের কবিতা মানেই হলো শব্দের পরিমিতি আর গভীর জীবনবোধের মিশেল। তাঁর গদ্যও ঠিক ততটাই ধারালো এবং বিশ্লেষণাত্মক। আপনার আগ্রহের ওপর ভিত্তি করে আমি দুটি ভিন্ন দিক সংক্ষেপে তুলে ধরছি:
১. জনপ্রিয় একটি কবিতা: 'বাবরের প্রার্থনা'
এই কবিতাটি তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ কাজ। এখানে সম্রাট বাবরের কণ্ঠস্বরে কবি আসলে এক চরম সংকটের কথা বলেছেন। মুঘল সম্রাট বাবর যেমন নিজের জীবনের বিনিময়ে পুত্র হুমায়ুনের প্রাণ ভিক্ষা করেছিলেন, কবিও এখানে আগামী প্রজন্মের জন্য এক সুন্দর ও নিরাপদ পৃথিবীর প্রার্থনা করেছেন।
"ধ্বংস করে দাও আমাকে যদি চাও / আমার সন্ততি স্বপ্নে থাক।"
২. সাহিত্য সমালোচনা: রবীন্দ্রচর্চা
শঙ্খ ঘোষকে আধুনিক কালের শ্রেষ্ঠ রবীন্দ্র-বিশেষজ্ঞ বলা হয়। রবীন্দ্রনাথকে তিনি প্রথাগত ভক্তির বাইরে গিয়ে একজন রক্ত-মাংসের মানুষ এবং শিল্পী হিসেবে বিচার করেছেন।
'ওকাম্পোর রবীন্দ্রনাথ': ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর সাথে রবীন্দ্রনাথের সম্পর্ক ও সেই সময়ের সৃজনশীল আদান-প্রদান নিয়ে এটি একটি অসাধারণ গবেষণা।
'এ আমির আবরণ': এখানে তিনি রবীন্দ্রনাথের আত্মপরিচয় ও তাঁর সৃষ্টির দর্শন নিয়ে আলোচনা করেছেন।
শঙ্খ ঘোষের ব্যক্তিত্বের দুটি দিকই খুব চমৎকার। একদিকে তিনি যেমন 'সিরিয়াস' কবি, অন্যদিকে ছোটদের জন্য তাঁর কলম ছিল এক্কেবারে হালকা আর মজার।
আপনি যেহেতু অপশন দিয়েছেন, আমি বরং তাঁর ছোটদের মজার ছড়া দিয়েই শুরু করতে চাই। কারণ, গম্ভীর আলোচনার ভিড়ে তাঁর এই সহজ-সরল রূপটি অনেক সময় আড়ালে পড়ে যায়।
ছোটদের জন্য শঙ্খ ঘোষ (কুন্তক)
ছোটদের জন্য লেখার সময় তিনি প্রায়ই 'কুন্তক' ছদ্মনাম ব্যবহার করতেন। তাঁর ছড়াগুলোর বৈশিষ্ট্য হলো সেগুলোর ছন্দ এবং শব্দের অদ্ভুত সব খেলা।
যেমন তাঁর বিখ্যাত একটি ছড়া:
"ওরে ওরে ওরে রে / আম পাকলে ধরে রে / আম পাড়লে নড়ে রে / আম খেলে পড়ে রে..."
আবার তাঁর 'অল্পবয়সী রাজা' বা **'সবই কল কব্জার খেলা'**র মতো বইগুলোতে শিশুদের মনের গহীন জগতের কথা খুব সুন্দর করে ফুটে উঠেছে। বড়দের শাসন আর ছোটদের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা তাঁর ছড়ায় প্রায়ই কৌতুকের মোড়কে আসত।
তবে আপনি যদি তাঁর কবিতার ব্যাখ্যা শুনতে চান, তবে নিচের যেকোনো একটি নিয়ে আমরা আলোচনা করতে পারি:
'মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে': আধুনিক যুগে মানুষের আত্মপ্রচার আর মেকি হওয়ার বিরুদ্ধে এক জোরালো প্রতিবাদ।
'লাইনেই ছিলাম বাবা': সমসাময়িক রাজনীতির সুযোগসন্ধানী চরিত্রদের নিয়ে এক নিপুণ ব্যঙ্গ।
'যমুনাবতী': তেভাগা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে লেখা এক মর্মস্পর্শী প্রতিবাদী কবিতা।
'মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে' কবিতাটির গভীরে প্রবেশ করতেই বেশি উৎসাহী। কারণ বর্তমান সময়ের 'সোশ্যাল মিডিয়া' আর 'সেলফ-প্রমোশন'-এর যুগে এই কবিতাটি যেন কয়েক দশক আগেই লেখা এক ভবিষ্যৎবাণী!
আসুন, এই কবিতাটির সারমর্ম একটু সহজ করে বুঝে নিই:
'মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে' - এর মূল সুর
১. অস্তিত্বের সংকট: কবি বলছেন, আমাদের আসল মুখ বা ব্যক্তিত্ব আজ হারিয়ে যাচ্ছে। চারদিকে শুধু বিজ্ঞাপনের চাকচিক্য। আমরা যা নয়, নিজেকে তার চেয়ে বড় বা ভালো করে দেখানোর যে প্রতিযোগিতা, তাতেই আমাদের আসল রূপটি ঢাকা পড়ে যাচ্ছে।
২. একাকীত্ব: বিজ্ঞাপনের ভিড়ে মানুষ যখন নিজেকে পণ্য হিসেবে তুলে ধরে, তখন সে আসলে ভেতর থেকে খুব একা হয়ে যায়। কবি এখানে দেখিয়েছেন কীভাবে মেকি প্রচারের আড়ালে মানুষের প্রকৃত আবেগগুলো হারিয়ে যায়।
৩. প্রতিবাদী সুর: কবিতাটি একটি শান্ত কিন্তু দৃঢ় প্রতিবাদ। কবি বলছেন—
"একলা হয়ে দাঁড়িয়ে আছি / তোমার জন্য গলির কোণে / ভাবি আমার মুখ ঢেকে যায় / বিজ্ঞাপনে।"
এখানে 'তুমি' হতে পারে ভালোবাসা, সত্য অথবা শুদ্ধ মানবিকতা—যাকে কবি খুঁজছেন, কিন্তু বিজ্ঞাপনের পোস্টারে ঢাকা পড়া পৃথিবীতে তাকে খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।
শঙ্খ ঘোষের এই কবিতাটি আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, নিজেকে জাহির করার চেয়ে নিজের সত্যকে ধরে রাখা অনেক বেশি জরুরি।
পড়ার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ।। ভালো লাগলে অবশ্যই লাইক শেয়ার করুন।।লেখক : আব্দুল মুসরেফ খাঁন email :lib.pbc@gmail.com
- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার -১৯৭০ - বিশ্বনাথ সত্যনারায়ণ - তেলুগু - রামায়ণ কল্পবৃক্ষমু

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার - ১৯৭১ -বিষ্ণু দে -বাংলা- স্মৃতি সত্তা ভবিষ্যত
- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার - ১৯৭২ -রামধারী সিং 'দিনকর' - হিন্দি - উর্বশী
- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার -১৯৭৩- ডি আর বেন্দ্রে এবং গোপীনাথ মোহান্তি - কন্নড়/ওড়িয়া - নাকুতান্তি / মাটিমাতাল

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার - ১৯৭৪ - বিষ্ণু সখারাম খান্দেকর - মারাঠি -যযাতি

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার -১৯৭৫ - পি ভি আকিলান - তামিল - চিত্রাপ্পাবাই

- মালয়ালম কবি জি শঙ্কর কুরুপ

- কথাসাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস 'গণদেবতা'-

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার যৌথভাবে দুজন সাহিত্যিককে প্রদান করা হয়েছিল—কন্নড় কবি কে. ভি. পুত্তাপ্পা (কুভেম্পু) এবং গুজরাতি কবি উমাশঙ্কর যোশী।

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার -১৯৬৮ - সুমিত্রানন্দন পন্ত - হিন্দি -চিদাম্বরা

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার -১৯৬৯ - ফিরাক গোরখপুরী - উর্দু - গুল-এ-নগমা

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার -১৯৭০ - বিশ্বনাথ সত্যনারায়ণ - তেলুগু - রামায়ণ কল্পবৃক্ষমু

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার - ১৯৭৬ - আশাপূর্ণা দেবী- বাংলা - প্রথম প্রতিশ্রুতি

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ১৯৭৭ | কে শিবরাম করন্থ | কন্নড় | মুকাজ্জিয়া কনসুগলু |

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ১৯৭৮ | এস এইচ ভি বাৎসায়ন | হিন্দি | কিতনি নাও মে কিতনি বার |

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ১৯৭৯ | বীরেন্দ্র কুমার ভট্টাচার্য | অসমীয়া | মৃত্যুঞ্জয় |

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ১৯৮০ | এস কে পোট্টেক্কাট | মালয়ালম | ওরু দেশথিন্তে কথা |

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ১৯৮১ | অমৃতা প্রীতম | পাঞ্জাবি | কাগজ তে ক্যানভাস |

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ১৯৮২ | মহাদেবী বর্মা | হিন্দি | সার্বিক অবদান (যামা - বিশেষ উল্লেখে) |

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ১৯৯১ | সুভাষ মুখোপাধ্যায় | বাংলা

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ১৯৯৬ | মহাশ্বেতা দেবী | বাংলা

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ১৯৯৯ | নির্মল ভার্মা এবং গুরুদয়াল সিং | হিন্দি/পাঞ্জাবি

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ২০০৫ | কুনওয়ার নারায়ণ | হিন্দি

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ২০১০ | চন্দ্রশেখর কাম্বার | কন্নড়

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ২০১৬ | শঙ্খ ঘোষ | বাংলা

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ২০১৮ | অমিতাভ ঘোষ | ইংরেজি

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ২০১৯ | আক্কিথাম নাম্বুথিরি | মালয়ালম

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ২০২১ | নীলমণি ফুকন | অসমীয়া

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ২০২২ | দামোদর মৌজো | কোঙ্কানি

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ২০২৩ | গুলজার এবং জগদ্গুরু রামভদ্রাচার্য | উর্দু/সংস্কৃত

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ২০২৪ | বিনোদ কুমার শুক্ল | হিন্দি



0 Comments