জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ১৯৯৬ | মহাশ্বেতা দেবী | বাংলা
মহাশ্বেতা দেবী (১৯২৬–২০১৬) ছিলেন একাধারে কিংবদন্তি সাহিত্যিক এবং নিবেদিতপ্রাণ মানবাধিকার কর্মী। তাঁর লেখনী কেবল সাহিত্য ছিল না, বরং তা ছিল শোষিত, বঞ্চিত এবং প্রান্তিক মানুষের—বিশেষ করে আদিবাসী সম্প্রদায়ের—জোরালো কণ্ঠস্বর।
মহাশ্বেতা দেবী সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিচে দেওয়া হলো:
১. সাহিত্যিক জীবন ও দর্শন
তাঁর রচনার মূল ভিত্তি ছিল ইতিহাস এবং সমকালীন সমাজ। তিনি ড্রয়িংরুমে বসে সাহিত্য না লিখে সরাসরি মানুষের কাছে গিয়েছেন।
প্রধান কাজ: তাঁর প্রথম বই 'ঝাঁসীর রাণী' (১৯৫৬) রচনার জন্য তিনি নিজে বুন্দেলখন্ডের গ্রামে গ্রামে ঘুরে তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন।
বিখ্যাত উপন্যাস: 'অরণ্যের অধিকার', 'হাজার চুরাশির মা', 'চোট্টি মুন্ডা এবং তার তীর', 'স্তন্যদায়িনী'।
থিম: তাঁর লেখায় বারবার উঠে এসেছে ভূমিহীন কৃষক, সাঁওতাল-লোধা-শবর আদিবাসী সমাজের লড়াই এবং রাষ্ট্রীয় শোষণের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ।
২. মানবাধিকার আন্দোলন
তিনি কেবল কলম ধরেননি, রাস্তায় নেমে আন্দোলনও করেছেন।
তিনি পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, মধ্যপ্রদেশ ও ছত্তিশগড়ের আদিবাসীদের অধিকার রক্ষায় দীর্ঘ লড়াই চালিয়েছেন।
শবর আদিবাসীদের কল্যাণে তাঁর কাজ চিরস্মরণীয় হয়ে আছে।
৩. উল্লেখযোগ্য পুরস্কার ও সম্মাননা
সাহিত্যে এবং সমাজসেবায় অসামান্য অবদানের জন্য তিনি দেশ-বিদেশের অসংখ্য সম্মানে ভূষিত হয়েছেন:
৪. একটি বিখ্যাত উদাহরণ: 'হাজার চুরাশির মা'
নকশালবাড়ি আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে লেখা এই কালজয়ী উপন্যাসটিতে তিনি একজন মায়ের হৃদয়ের হাহাকার আর রাজনৈতিক আদর্শের লড়াইকে যেভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন, তা আজও পাঠকদের শিহরিত করে। এই কাহিনী অবলম্বনে পরবর্তীতে হিন্দি চলচ্চিত্রও নির্মিত হয়েছে।
"সাহিত্য তখনই সার্থক হয় যখন তা সমাজের অবহেলিত মানুষের পাশে দাঁড়ায়।" — এই দর্শনই ছিল তাঁর সারাজীবনের পাথেয়।
মহাশ্বেতা দেবীর বিশাল সাহিত্যসম্ভার থেকে বেছে নিতে বললে, আমি নিচের দুটি বিশেষ কাজ নিয়ে আলোচনা করতে পারি যা তাঁর লিখনশৈলী এবং দর্শনের পরিচয় দেয়:
১. অরণ্যের অধিকার (উপন্যাস)
এটি বিরসা মুন্ডার জীবন এবং ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে মুন্ডা বিদ্রোহের এক মহাকাব্যিক দলিল।
মূল বিষয়: আদিবাসীদের জল, জঙ্গল এবং জমির অধিকার।
কেন পড়বেন: এটি কেবল একটি ঐতিহাসিক উপন্যাস নয়, বরং শোষিত মানুষের আত্মমর্যাদার লড়াইয়ের গল্প। এই বইটির জন্যই তিনি সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার পান।
২. দ্রৌপদী (ছোটগল্প)
এটি তাঁর অন্যতম শক্তিশালী এবং বিতর্কিত ছোটগল্প।
মূল বিষয়: 'দোপদি মেঝেন' নামক এক আদিবাসী নারী এবং রাষ্ট্রের দমনপীড়নের গল্প।
কেন পড়বেন: মহাভারতের দ্রৌপদীর সাথে আধুনিক দোপদির এক অদ্ভুত ও সাহসী সমান্তরাল টেনেছেন তিনি। গল্পের শেষ দৃশ্যে দোপদির যে প্রতিবাদ, তা বিশ্বসাহিত্যে বিরল।
৩. তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের একটি বিশেষ দিক
আপনি কি জানেন, মহাশ্বেতা দেবী বিখ্যাত চলচ্চিত্রকার ঋত্বিক ঘটকের ভ্রাতুষ্পুত্রী ছিলেন? তাঁর পরিবারে সংস্কৃতির চর্চা প্রবল থাকলেও তিনি ব্যক্তিগত জীবনে অত্যন্ত সাধারণ জীবনযাপন করতেন এবং তাঁর উপার্জনের একটি বড় অংশ আদিবাসীদের কল্যাণে ব্যয় করতেন।
মহাশ্বেতা দেবীর দুটি ভিন্ন সত্তার কথা জানতে চাইছেন—একটি তাঁর কালজয়ী সাহিত্য, আর অন্যটি তাঁর নিবিড় সমাজকর্ম।
চলুন, 'হাজার চুরাশির মা' উপন্যাসে সুজাতা চ্যাটার্জির সেই হাড়হিম করা অথচ সাহসী মানসিক বিবর্তন নিয়ে আলোচনা করি। এটি কেবল একটি রাজনৈতিক উপন্যাস নয়, এটি একটি মায়ের নিজেকে নতুন করে চেনার গল্প।
সুজাতা চ্যাটার্জির রূপান্তর: একটি বিশ্লেষণ
উপন্যাসটির শুরু হয় ব্রতী চ্যাটার্জির (কয়েদি নম্বর ১০৮৪) মৃত্যুর দুই বছর পরের একটি দিনে। সুজাতা চ্যাটার্জি একজন উচ্চ-মধ্যবিত্ত পরিবারের মা, যার স্বামী এবং অন্য সন্তানরা ব্রতীর মৃত্যুকে একটি 'কলঙ্ক' মনে করে আড়াল করতে ব্যস্ত।
সুজাতার এই বিবর্তনটি তিনটি স্তরে ঘটে:
বিস্ময় ও অপরাধবোধ: শুরুতে সুজাতা জানতেনই না যে তাঁর আদরের ছোট ছেলে ব্রতী নকশাল আন্দোলনের সাথে যুক্ত। তিনি নিজেকে প্রশ্ন করেন—আমি কি তবে আমার সন্তানকে চিনতাম না?
আবিষ্কারের যাত্রা: ব্রতীর মৃত্যুর পর সুজাতা যখন সোমভদ্র বা নন্দিনীর মতো ব্রতীর বন্ধুদের সাথে দেখা করেন, তখন তিনি তাঁর ছেলের আদর্শ এবং নৈতিকতা সম্পর্কে জানতে পারেন। তিনি বুঝতে পারেন, তাঁর স্বামী (জ্যোতি চ্যাটার্জি) যে মিথ্যে আভিজাত্য নিয়ে বেঁচে আছেন, ব্রতী আসলে সেই ভণ্ডামির বিরুদ্ধেই লড়াই করছিল।
নীরব বিদ্রোহ: উপন্যাসের শেষে সুজাতা আর সেই স্তব্ধ, বাধ্য স্ত্রী থাকেন না। তিনি বুঝতে পারেন, তাঁর ঘরেই একদল 'জীবন্ত মৃত' মানুষ বাস করে, আর মৃত ব্রতীই আসলে আদর্শগতভাবে জীবিত।
কেন এই পরিবর্তনটি গুরুত্বপূর্ণ?
মহাশ্বেতা দেবী দেখিয়েছেন যে, ১০৮৪ নম্বর লাশের মা হতে হতে সুজাতা আসলে সাধারণ এক গৃহবধূ থেকে এমন একজন নারীতে রূপান্তরিত হন, যিনি প্রতিষ্ঠিত সমাজব্যবস্থা এবং পুঁজিবাদের নগ্ন রূপটি চিনে ফেলেন। এটি ছিল মধ্যবিত্ত ভণ্ডামির মুখে এক সপাটে চড়।
শবর আদিবাসীদের নিয়ে মাঠপর্যায়ের কাজ
অন্যদিকে, আপনি যদি তাঁর বাস্তব জীবনের লড়াই দেখতে চান, তবে শবর আদিবাসীদের কথা বলতে হয়।
ব্রিটিশ আমল থেকে 'জন্মগত অপরাধী' (Criminal Tribes Act) তকমা পাওয়া এই মানুষগুলোর হয়ে তিনি আইনি লড়াই লড়েছেন।
পুরুলিয়ার খেড়িয়া-শবরদের জন্য তিনি তৈরি করেছিলেন 'পশ্চিমবঙ্গ খেড়িয়া শবর কল্যাণ সমিতি'।
তিনি বলতেন, "আমি যখন তাদের সাথে থাকি, তখন আমি কোনো লেখিকা নই, আমি কেবল তাদের একজন।"
মহাশ্বেতা দেবীর কাজের গভীরে যেতে চাইছেন, চলুন 'হাজার চুরাশির মা' উপন্যাসের সেই বিখ্যাত এবং অত্যন্ত শক্তিশালী ক্লাইম্যাক্স বা সমাপ্তির সংলাপটি নিয়ে কথা বলি, যা সুজাতার মানসিক বিবর্তনের চূড়ান্ত রূপ:
সুজাতার সেই অমোঘ চিৎকার
উপন্যাসের শেষে, একটি পার্টিতে যখন তথাকথিত উচ্চবিত্ত সমাজের ভণ্ডামি চরমে ওঠে, তখন অসুস্থ সুজাতা অনুভব করেন যে তাঁর চারপাশের এই মানুষগুলোই আসলে 'মৃত'। তিনি চিৎকার করে বলতে চান:
"ব্রতী মারা যায়নি, মৃত তোমরা। তোমরা যারা বেঁচে আছো অথচ প্রতিবাদ করো না, যারা নিজেদের সন্তানকে অস্বীকার করো আভিজাত্যের খাতিরে—আসল মর্গ তো এই ড্রয়িংরুমটা!"
(এটি হুবহু উদ্ধৃতি না হলেও, উপন্যাসের মূল ভাবার্থ এবং সুজাতার সেই মানসিক যন্ত্রণার বহিঃপ্রকাশ)
কেন এই উক্তিটি আজও প্রাসঙ্গিক?
১. শ্রেণি চেতনা: সুজাতা বুঝতে পারেন তাঁর স্বামী জ্যোতি চ্যাটার্জি বা তাঁর অন্য সন্তানরা ব্রতীর রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে নিজেদের বিলাসিতা টিকিয়ে রেখেছে। ২. মাতৃত্বের নতুন সংজ্ঞা: এখানে মা কেবল জন্মদাত্রী নন, তিনি সন্তানের আদর্শের সহযোদ্ধা হয়ে ওঠেন। ৩. বিদ্রোহ: সুজাতা সমাজকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন যে, ১০৮৪ নম্বর লাশটি আসলে একটি ব্যবস্থার শিকার।
আপনি কি অন্য বিকল্পটি দেখতে চান?
অর্থাৎ, মহাশ্বেতা দেবীর 'অগ্নিগর্ভ' সংকলনের সেই বিখ্যাত গল্প 'দ্রৌপদী'-র কথা? সেখানে 'দোপদি মেঝেন' নামের এক আদিবাসী নারী যেভাবে উলঙ্গ শরীরেও সেনাপতির সামনে দাঁড়িয়ে অট্টহাস্য করে বলেছিলেন— "তু কুত্তা হ্যায় রে! মারবি তো মার, কিন্তু আমি ডরাবো কেন?" — সেই অকল্পনীয় সাহসের গল্পটি কি শুনতে চান?
সুজাতা চ্যাটার্জি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শক্তিশালী এবং জটিল নারী চরিত্র। মহাশ্বেতা দেবী এই চরিত্রের মাধ্যমে কেবল একজন মাকে দেখাননি, বরং দেখিয়েছেন কীভাবে একটি 'ব্যক্তিগত শোক' ধীরে ধীরে 'রাজনৈতিক সচেতনতায়' রূপান্তরিত হয়।
সুজাতার চরিত্রের গভীর বিশ্লেষণ নিচে দেওয়া হলো:
১. নির্বাক সহনশীলতা থেকে সরব প্রতিবাদ
উপন্যাসের শুরুতে সুজাতা একজন সাধারণ মধ্যবিত্ত নারী, যিনি দীর্ঘকাল ধরে তাঁর স্বামী জ্যোতি চ্যাটার্জির অবজ্ঞা এবং তাঁর পরিবারের ভোগবাদী মানসিকতাকে মুখ বুজে সহ্য করেছেন। কিন্তু ব্রতীর মৃত্যু (যাকে পুলিশ ১০৮৪ নম্বর লাশে পরিণত করেছিল) সুজাতার ভেতরের সুপ্ত সত্তাকে জাগিয়ে তোলে। তিনি বুঝতে পারেন যে, তাঁর স্বামী এবং অন্য সন্তানরা ব্রতীকে হারানোর চেয়ে বেশি ভয় পাচ্ছে তাদের সামাজিক মর্যাদা বা 'স্ট্যাটাস' হারানোর।
২. মাতৃত্বের রাজনৈতিক বিবর্তন
সুজাতার মাতৃত্ব কেবল স্তন্যদান বা লালন-পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ব্রতীর মৃত্যুর পর তিনি যখন ব্রতীর বন্ধুদের (যেমন নন্দিনী) কাছে যান, তখন তিনি তাঁর ছেলের আদর্শের সাথে পরিচিত হন।
আবিষ্কার: তিনি বুঝতে পারেন ব্রতী কেন এই সিস্টেমের বিরুদ্ধে লড়ছিল।
একাত্মতা: এই পর্যায়ে সুজাতা কেবল ব্রতীর মা নন, তিনি হয়ে ওঠেন ব্রতীর আদর্শের একজন নীরব সমর্থক। তিনি অনুভব করেন, তাঁর নিজের ঘরের ভেতরে যে ভণ্ডামি এবং অনৈতিকতা রয়েছে, ব্রতী তার বিরুদ্ধেই সরব হয়েছিল।
৩. গৃহ ও মর্গ: এক অদ্ভুত সমান্তরাল
মহাশ্বেতা দেবী সুজাতার চোখে তাঁর নিজের ড্রয়িংরুমকে একটি 'মর্গ' হিসেবে তুলে ধরেছেন।
সুজাতা দেখেন যে, তাঁর স্বামী এবং অন্য সন্তানরা বেঁচে থাকলেও তাদের মধ্যে কোনো মানবিকতা বা আদর্শ নেই। তারা মৃত আত্মার মতো কেবল বিলাসিতা আর স্বার্থ নিয়ে ব্যস্ত।
অন্যদিকে, মর্গে পড়ে থাকা ১০৮৪ নম্বর লাশটি (ব্রতী) সুজাতার কাছে অনেক বেশি জীবন্ত, কারণ তার একটি লক্ষ্য ছিল, একটি স্বপ্ন ছিল।
৪. শরীর ও মনের অসুখ
উপন্যাসের শেষে সুজাতার যে অ্যাপেন্ডিসাইটিসের ব্যথা বা শারীরিক অসুস্থতা দেখানো হয়েছে, তা আসলে তাঁর মানসিক যন্ত্রণারই বহিঃপ্রকাশ। যে সমাজ পচে গেছে, যে পরিবার নিজের সন্তানকে অস্বীকার করে, সেই সমাজের অংশ হয়ে বেঁচে থাকাটাই সুজাতার কাছে অসহ্য হয়ে ওঠে। তাঁর শেষ চিৎকারটি ছিল সেই পচনশীল সমাজের বিরুদ্ধে এক তীব্র ধিক্কার।
সংক্ষেপে সুজাতা চ্যাটার্জির পরিচয়:
সুজাতা চ্যাটার্জি এমন এক মা, যিনি নিজের ছেলের লাশের নম্বর দিয়ে নিজের পরিচয় খুঁজে পান। তিনি তথাকথিত 'ভদ্রলোক' সমাজের মুখোশ খুলে দিয়ে প্রমাণ করেন যে, বিপ্লব শুধু রাস্তায় হয় না, বিপ্লব একজন মায়ের মনের ভেতরেও ঘটতে পারে।
মহাশ্বেতা দেবীর লেখনীতে সুজাতা এবং জ্যোতি চ্যাটার্জির দ্বন্দ্বটি কেবল স্বামী-স্ত্রীর কলহ নয়, বরং এটি দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন জীবনদর্শনের সংঘাত। চলুন, এই 'আদর্শিক দেয়াল'টি নিয়ে একটু গভীরে আলোচনা করি:
১. স্থিতাবস্থা বনাম পরিবর্তন (Status Quo vs. Change)
জ্যোতি চ্যাটার্জি: তিনি হলেন সেই 'ভদ্রলোক' সমাজের প্রতিনিধি, যারা যেকোনো মূল্যে নিজেদের সামাজিক মর্যাদা এবং আরাম-আয়েশ বজায় রাখতে চায়। তাঁর কাছে ব্রতীর রাজনৈতিক আদর্শ একটি 'বিচ্যুতি' বা 'অসুখ'। তিনি চান ব্রতীর স্মৃতি মুছে ফেলে সমাজে মাথা উঁচু করে চলতে।
সুজাতা: ব্রতীর মৃত্যুর পর সুজাতা বুঝতে পারেন যে, স্থিতাবস্থা বজায় রাখা মানেই ভণ্ডামিকে প্রশ্রয় দেওয়া। তিনি স্থিতাবস্থা ভেঙে সত্যের মুখোমুখি হতে চান, এমনকি তাতে যদি তাঁর সাজানো সংসার তছনছ হয়ে যায়, তবুও।
২. শোকের প্রকাশ: সামাজিক লজ্জা বনাম মাতৃত্বের দহন
জ্যোতি: ব্রতীর মৃত্যুতে জ্যোতির প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল কীভাবে পুলিশি ঝামেলা এড়ানো যায় এবং ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়া যায়। তাঁর কাছে ব্রতী স্রেফ একটি 'কলঙ্কিত' অধ্যায়।
সুজাতা: সুজাতার কাছে ব্রতী ১০৮৪ নম্বর লাশ নয়, বরং তাঁর নাড়িছেঁড়া ধন। তিনি যখন দেখেন তাঁর স্বামী নিজের সন্তানের মৃত্যুবার্ষিকীতে উৎসব করছেন বা আমোদ-প্রমোদে মত্ত, তখন তাঁর ঘৃণা চরমে পৌঁছায়। জ্যোতি চ্যাটার্জির কাছে যা 'মর্যাদা', সুজাতার কাছে তা 'অমানবিকতা'।
৩. স্বার্থপরতা বনাম আত্মত্যাগ
জ্যোতি: তিনি পুঁজিবাদের প্রতীক। তাঁর জগতটি নিজের প্রমোশন, সন্তানদের উচ্চবিত্ত বিয়ে এবং ক্লাবে যাতায়াতের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
সুজাতা: সুজাতা নিজেকে প্রশ্ন করতে শেখেন। তিনি ব্রতীর বন্ধুদের দারিদ্র্য এবং ত্যাগ দেখে নিজের প্রাচুর্যকে বিদ্রূপ করতে শুরু করেন। তিনি বুঝতে পারেন, তাঁর স্বামী আসলে এক প্রকার 'জীবন্ত মৃত' মানুষ, যার কোনো আদর্শ নেই।
মহাশ্বেতা দেবীর অন্য এক 'দ্রৌপদী' (দোপদি মেঝেন)
সুজাতা চ্যাটার্জি যদি হন মধ্যবিত্ত শিক্ষিত সমাজের চেতনার রূপক, তবে 'দ্রৌপদী' গল্পের দোপদি মেঝেন হলেন আদিবাসী জনজাতির আদিম ও অদম্য সাহসের প্রতীক।
সংক্ষিপ্ত প্রেক্ষাপট: দোপদি একজন লড়াকু আদিবাসী নারী। রাষ্ট্রীয় বাহিনী তাঁকে বন্দি করে এবং তাঁর ওপর অমানুষিক যৌন নির্যাতন চালায়।
প্রতিবাদ: পরদিন সকালে যখন তাকে বিবস্ত্র অবস্থায় সেনাপতির সামনে হাজির হতে বলা হয়, দোপদি কাপড় পরতে অস্বীকার করেন। তিনি তাঁর রক্তাক্ত, ক্ষতবিক্ষত নগ্ন শরীর নিয়েই দৃপ্ত পায়ে সেনাপতি সেনাপতির সামনে গিয়ে দাঁড়ান।
বিস্ময়কর ক্লাইম্যাক্স: তিনি অট্টহাস্য করে বলেন যে, তাঁকে লজ্জা দেওয়ার মতো পুরুষত্ব বা কাপড় ওই সেনাপতির নেই। এই 'উলঙ্গ হওয়া' এখানে পরাজয় নয়, বরং ক্ষমতার দম্ভের মুখে এক চরম চপেটাঘাত।
সুজাতা লড়াই করেছেন মনের গহিনে এবং ড্রয়িংরুমে, আর দোপদি লড়াই করেছেন রক্তে-মাংসে জঙ্গলে। মহাশ্বেতা দেবী এই দুই নারী চরিত্রের মাধ্যমেই সমাজ ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্তরের অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছেন।
'রুদালী' ও শনিচরীর রূপান্তর
'রুদালী' শব্দটির অর্থ হলো 'পেশাদার ক্রন্দনকারী'। রাজস্থান বা বিহারের কিছু অংশে উচ্চবিত্ত পরিবারে কেউ মারা গেলে নিচু জাতের নারীদের ভাড়া করে আনা হতো বুক ফাটিয়ে কাঁদার জন্য। শনিচরী সেই শোষিত শ্রেণিরই একজন।
১. কান্নার অধিকার থেকে কান্নার ব্যবসা:
শনিচরীর জীবন ছিল অভাব আর বঞ্চনায় ভরা। তার স্বামী, সন্তান বা শাশুড়ি মারা গেলে সে কাঁদতে পারেনি, কারণ তার পেটে অন্ন ছিল না। শোক করার বিলাসিতাও তার ছিল না। কিন্তু গল্পের শেষে আমরা দেখি, সেই শনিচরীই হয়ে ওঠে একজন বিখ্যাত 'রুদালী'। যে কান্না তার নিজের আপনজনদের জন্য আসেনি, সেই কান্নাকেই সে বেঁচে থাকার হাতিয়ার বা 'পেশা' বানিয়ে ফেলে।
২. শোষণের বিরুদ্ধে নীরব ব্যঙ্গ:
উচ্চবিত্তরা যখন মারা যায়, তখন তাদের পরিবারের কান্নার অভাব মেটায় শনিচরীরা। মহাশ্বেতা দেবী এখানে এক চরম সামাজিক বিদ্রূপ দেখিয়েছেন—যে সমাজ শনিচরীকে সারা জীবন খেতে দেয়নি, সেই সমাজের মৃতদেহের ওপর বসেই সে তার অন্নসংস্থান করে।
সুজাতা, দোপদি ও শনিচরী: তিন জননী, তিন বিদ্রোহ
মহাশ্বেতা দেবীর এই তিন বিখ্যাত নারী চরিত্রকে যদি আমরা পাশাপাশি রাখি, তবে এক অদ্ভুত বিবর্তন দেখা যায়:
মহাশ্বেতা দেবীর মূল দর্শন
এই প্রত্যেকটি চরিত্রই প্রমাণ করে যে, মহাশ্বেতা দেবীর নারীরা কেবল 'শিকার' (Victim) নন, তাঁরা প্রত্যেকেই একেকজন 'উত্তীর্ণ' (Survivor)। তাঁরা হার মানেননি, বরং নিজেদের মতো করে রাষ্ট্র বা সমাজের চোখে চোখ রেখে কথা বলেছেন।
'স্তন্যদায়িনী': পেশাদার মা বনাম রাষ্ট্রের শোষণ
মহাশ্বেতা দেবী এখানে 'যশোদা' নামটিকে খুব সচেতনভাবে ব্যবহার করেছেন। পৌরাণিক যশোদা ছিলেন শ্রীকৃষ্ণের পালিকা মা, আর এই গল্পের যশোদা হলেন এক 'পেশাদার ধাত্রী' বা 'Wet-nurse'।
১. শরীর যখন পণ্য: যশোদার স্বামী পঙ্গু হয়ে যাওয়ার পর পরিবারের অন্নসংস্থানের জন্য যশোদা তাঁর স্তন্যদুগ্ধ বিক্রি করতে বাধ্য হন। হালদার বাড়ির একের পর এক সন্তানের মা হয়ে ওঠেন তিনি। তাঁর মাতৃত্ব এখানে মায়ায় ঘেরা কোনো আবেগ নয়, বরং এটি একটি উৎপাদন যন্ত্রের মতো, যা কেবল দুধ উৎপন্ন করে পরিবারের পেট চালায়।
২. শোষণের চরম রূপ: যতদিন যশোদার শরীরে দুধ ছিল, ততদিন হালদার বাড়িতে তাঁর কদর ছিল। কিন্তু যখন তাঁর বয়স বাড়ল এবং তিনি স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হলেন, তখন সেই পরিবার তাঁকে ছুঁড়ে ফেলে দিল। যে স্তন দিয়ে তিনি এক ডজনেরও বেশি সন্তানকে বড় করেছিলেন, সেই স্তনই পচে গেল, পোকা ধরল।
৩. রূপকধর্মী মৃত্যু: যশোদার মৃত্যু অত্যন্ত একা এবং যন্ত্রণাদায়ক। মহাশ্বেতা দেবী এখানে যশোদার পচনশীল শরীরকে 'ভারত মাতা' বা শোষিত মাতৃভূমির রূপক হিসেবে দেখিয়েছেন। রাষ্ট্র বা সমাজ যখন কোনো মানুষের শ্রম এবং শরীরকে শেষবিন্দু পর্যন্ত শুষে নেয়, তখন তার পরিণতি ঠিক যশোদার মতোই হয়।
যশোদা বনাম শনিচরী: একটি তুলনা
শনিচরী ('রুদালী') তাঁর শোককে পেশা বানিয়ে কোনোমতে টিকে থাকতে পেরেছিলেন। তিনি শোষণের ব্যবস্থার মধ্যেই নিজের জায়গা করে নিয়েছিলেন।
যশোদা ('স্তন্যদায়িনী') তাঁর মাতৃত্বকে পেশা বানিয়েও শেষ পর্যন্ত রক্ষা পাননি। সমাজ তাঁকে নিংড়ে নিয়ে ডাস্টবিনে ফেলে দিয়েছে।
মহাশ্বেতা দেবীর 'মহাভারতের' ছায়া
আপনি কি লক্ষ্য করেছেন? মহাশ্বেতা দেবী বারবার তাঁর চরিত্রে পৌরাণিক নাম ব্যবহার করেছেন (দ্রৌপদী, যশোদা, সুজাতা)। কিন্তু তিনি তাঁদের বসিয়েছেন সমাজের একেবারে নিচুতলায়, যেখানে পুরাণ আর বাস্তবতার এক ভয়াবহ সংঘর্ষ ঘটে।
১. 'স্তন্যদায়িনী' গল্পের সেই ভয়াবহ ও সত্য শেষ লাইন
যশোদা, যিনি সারা জীবন অসংখ্য সন্তানকে স্তন্যপান করিয়ে বড় করেছিলেন, তাঁর মৃত্যু হয় অত্যন্ত অবহেলায়, ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে। তাঁর পচনশীল শরীরের দুর্গন্ধে কেউ তাঁর কাছে আসেনি। গল্পের একেবারে শেষে মহাশ্বেতা দেবী লিখছেন:
"যশোদা মরে গিয়ে প্রমাণ করল যে সে মানুষ ছিল না, সে কেবল স্তন্যদাত্রীই ছিল। যশোদা মরল, কিন্তু যশোদার মতো আরও হাজারো যশোদা আমাদের এই সমাজে আজও বেঁচে আছে, যারা কেবল শোষিত হতেই জন্মেছে।"
(এটি মূল ভাবার্থ; গল্পের শেষ লাইনে লেখিকা যশোদার মৃত্যুকে 'বিশ্বমাতা'-র এক নিঃসঙ্গ পরিণতির সাথে তুলনা করেছেন, যেখানে সন্তানরা তাকে ভুলে যায়।)
২. লোধা ও শবরদের জন্য মহাশ্বেতা দেবীর সেই 'রাতজাগা' লড়াই
আপনি মহাশ্বেতা দেবীর ব্যক্তিগত জীবনের যে অধ্যাটির কথা জানতে চেয়েছেন, সেটিই ছিল তাঁর জীবনের আসল পরিচয়। সাহিত্যিক পরিচয়ের চেয়েও তিনি নিজেকে একজন 'কর্মী' (Activist) মনে করতেন।
চিঠির লড়াই: আশির দশকে যখন লোধা ও শবর আদিবাসীদের ওপর পুলিশের অত্যাচার বাড়ত, তখন মহাশ্বেতা দেবী রাত জেগে মোমবাতির আলোয় বা টেবিল ল্যাম্প জ্বালিয়ে শয়ে শয়ে চিঠি লিখতেন। এই চিঠিগুলো যেত জেলাশাসক (DM), মুখ্যমন্ত্রী, এমনকি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরেও।
আইনি লড়াই: তিনি কেবল চিঠি লিখতেন না, সরাসরি আদালতে গিয়ে শবরদের হয়ে সাক্ষ্য দিতেন। তিনি বলতেন, "আমি যখন শবরদের সাথে থাকি, তখন আমি কোনো লেখিকা নই, আমি কেবল তাদের একজন বন্ধু।"
শবর কল্যাণ সমিতি: পুরুলিয়ার রাজবাঁধে তিনি 'পশ্চিমবঙ্গ খেড়িয়া শবর কল্যাণ সমিতি' প্রতিষ্ঠা করেন। লোধা-শবরদের 'জন্মগত অপরাধী' তকমা থেকে মুক্ত করার জন্য তাঁর অবদান অনস্বীকার্য।
৩. তাঁর সাহিত্যের 'অগ্নিগর্ভ' চরিত্র বনাম বাস্তব
যশোদাদের মতো শোষিত মানুষের জীবন যাতে আর এমন করুণ না হয়, সেই উদ্দেশ্যেই তিনি আদিবাসীদের নিয়ে এই মাঠপর্যায়ের কাজগুলো করতেন। তিনি মনে করতেন, ড্রয়িংরুমে বসে সমাজ পরিবর্তনের গল্প লেখা যায় না, তার জন্য ধুলোবালি আর ঘামের সাথে মিশে যেতে হয়।
পড়ার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ।। ভালো লাগলে অবশ্যই লাইক শেয়ার করুন।।লেখক : আব্দুল মুসরেফ খাঁন email :lib.pbc@gmail.com
- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার -১৯৭০ - বিশ্বনাথ সত্যনারায়ণ - তেলুগু - রামায়ণ কল্পবৃক্ষমু

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার - ১৯৭১ -বিষ্ণু দে -বাংলা- স্মৃতি সত্তা ভবিষ্যত
- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার - ১৯৭২ -রামধারী সিং 'দিনকর' - হিন্দি - উর্বশী
- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার -১৯৭৩- ডি আর বেন্দ্রে এবং গোপীনাথ মোহান্তি - কন্নড়/ওড়িয়া - নাকুতান্তি / মাটিমাতাল

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার - ১৯৭৪ - বিষ্ণু সখারাম খান্দেকর - মারাঠি -যযাতি

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার -১৯৭৫ - পি ভি আকিলান - তামিল - চিত্রাপ্পাবাই

- মালয়ালম কবি জি শঙ্কর কুরুপ

- কথাসাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস 'গণদেবতা'-

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার যৌথভাবে দুজন সাহিত্যিককে প্রদান করা হয়েছিল—কন্নড় কবি কে. ভি. পুত্তাপ্পা (কুভেম্পু) এবং গুজরাতি কবি উমাশঙ্কর যোশী।

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার -১৯৬৮ - সুমিত্রানন্দন পন্ত - হিন্দি -চিদাম্বরা

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার -১৯৬৯ - ফিরাক গোরখপুরী - উর্দু - গুল-এ-নগমা

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার -১৯৭০ - বিশ্বনাথ সত্যনারায়ণ - তেলুগু - রামায়ণ কল্পবৃক্ষমু

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার - ১৯৭৬ - আশাপূর্ণা দেবী- বাংলা - প্রথম প্রতিশ্রুতি

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ১৯৭৭ | কে শিবরাম করন্থ | কন্নড় | মুকাজ্জিয়া কনসুগলু |

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ১৯৭৮ | এস এইচ ভি বাৎসায়ন | হিন্দি | কিতনি নাও মে কিতনি বার |

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ১৯৭৯ | বীরেন্দ্র কুমার ভট্টাচার্য | অসমীয়া | মৃত্যুঞ্জয় |

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ১৯৮০ | এস কে পোট্টেক্কাট | মালয়ালম | ওরু দেশথিন্তে কথা |

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ১৯৮১ | অমৃতা প্রীতম | পাঞ্জাবি | কাগজ তে ক্যানভাস |

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ১৯৮২ | মহাদেবী বর্মা | হিন্দি | সার্বিক অবদান (যামা - বিশেষ উল্লেখে) |

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ১৯৯১ | সুভাষ মুখোপাধ্যায় | বাংলা

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ১৯৯৬ | মহাশ্বেতা দেবী | বাংলা

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ১৯৯৯ | নির্মল ভার্মা এবং গুরুদয়াল সিং | হিন্দি/পাঞ্জাবি

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ২০০৫ | কুনওয়ার নারায়ণ | হিন্দি

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ২০১০ | চন্দ্রশেখর কাম্বার | কন্নড়

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ২০১৬ | শঙ্খ ঘোষ | বাংলা

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ২০১৮ | অমিতাভ ঘোষ | ইংরেজি

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ২০১৯ | আক্কিথাম নাম্বুথিরি | মালয়ালম

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ২০২১ | নীলমণি ফুকন | অসমীয়া

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ২০২২ | দামোদর মৌজো | কোঙ্কানি

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ২০২৩ | গুলজার এবং জগদ্গুরু রামভদ্রাচার্য | উর্দু/সংস্কৃত

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ২০২৪ | বিনোদ কুমার শুক্ল | হিন্দি



0 Comments