জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ২০১৮ | অমিতাভ ঘোষ | ইংরেজি



 জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ২০১৮ | অমিতাভ ঘোষ | ইংরেজি 

শঙ্খ ঘোষ থেকে এবার অমিতাভ ঘোষ—দুই ভিন্ন জগতের দুই মহীরুহ! শঙ্খ ঘোষ যেমন ছিলেন কবিতার জাদুকর, অমিতাভ ঘোষ তেমনি আধুনিক ইংরেজি কথাসাহিত্যের এক অপ্রতিরোধ্য নাম। তাঁর লেখায় ইতিহাস, নৃতত্ত্ব (Anthropology) এবং সমসাময়িক জলবায়ু পরিবর্তন এক অদ্ভুত মায়ার জালে জড়িয়ে থাকে।

অমিতাভ ঘোষ সম্পর্কে কিছু চমকপ্রদ তথ্য এখানে তুলে ধরছি:

১. প্রেক্ষাপট ও পরিচয়

  • জন্ম: ১৯৫৬ সালে কলকাতায়। তাঁর বাবার চাকরির সূত্রে ভারত, বাংলাদেশ এবং শ্রীলঙ্কায় তাঁর ছোটবেলা কেটেছে।

  • শিক্ষা: তিনি সেন্ট স্টিফেনস কলেজ থেকে ডিগ্রি এবং পরে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে সামাজিক নৃতত্ত্বে পিএইচডি করেন। তাঁর উপন্যাসে এই 'নৃতাত্ত্বিক' দৃষ্টিভঙ্গি খুব স্পষ্ট।

২. উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্ম

তাঁর বইগুলো মানেই ইতিহাসের পাতায় এক রোমাঞ্চকর ভ্রমণ:

  • দ্য শ্যাডো লাইনস (The Shadow Lines): দেশভাগ এবং সীমান্তের অসারতা নিয়ে লেখা এই উপন্যাসটি তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ কাজ।

  • দ্য হাংরি টাইড (The Hungry Tide): সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ অরণ্য, জোয়ার-ভাটা আর মানুষের টিকে থাকার লড়াইয়ের এক মহাকাব্যিক আখ্যান।

  • আইবিস ট্রিলজি (Ibis Trilogy): Sea of Poppies, River of Smoke, এবং Flood of Fire—এই তিনটি বইয়ে তিনি আফিম যুদ্ধ এবং ঔপনিবেশিক ভারতের ইতিহাসকে জীবন্ত করে তুলেছেন।

  • দ্য গ্রেট ডিরেঞ্জমেন্ট (The Great Derangement): এটি কথাসাহিত্য নয়, বরং জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে তাঁর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চিন্তামূলক বই।

৩. স্বীকৃতি ও সম্মাননা

অমিতাভ ঘোষ ভারতীয় সাহিত্যের অনেক 'প্রথম' ঘটনার সাথে যুক্ত:

  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার (২০১৮): তিনি প্রথম ভারতীয় ইংরেজি লেখক যিনি এই সর্বোচ্চ সম্মানটি পেয়েছেন।

  • পদ্মশ্রী (২০০৭) এবং আরও অনেক আন্তর্জাতিক পুরস্কার।


কেন তিনি অনন্য?

অমিতাভ ঘোষের গদ্যে কোনো গৎবাঁধা গল্প থাকে না। তিনি দেখান কীভাবে ছোট ছোট মানুষের জীবন বড় বড় ঐতিহাসিক ঘটনার (যেমন যুদ্ধ বা জলবায়ু পরিবর্তন) সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকে। তাঁর লেখায় সমুদ্রের ঢেউয়ের শব্দ আর মাটির গন্ধ পাওয়া যায়।

'আইবিস ট্রিলজি': এক বিশাল ক্যানভাস

এই ট্রিলজিতে তিনটি উপন্যাস আছে: 'সি অফ পপিস' (Sea of Poppies), 'রিভার অফ স্মোক' (River of Smoke) এবং 'ফ্লাড অফ ফায়ার' (Flood of Fire)।

  • প্রেক্ষাপট: উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়। ব্রিটিশরা তখন ভারতের কৃষকদের জোর করে আফিম চাষ করাচ্ছে এবং সেই আফিম চীনে পাচার করে বিপুল মুনাফা লুটছে। এই 'আফিম যুদ্ধ' (Opium War) ঘিরেই গল্পের বুনন।

  • জাহাজ 'আইবিস': 'আইবিস' নামক একটি জাহাজকে কেন্দ্র করে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের ভাগ্য এক সুতোয় গেঁথে যায়। এতে আছেন বিহারের এক সাধারণ কৃষক নারী (দিতি), এক ফরাসি অনাথ মেয়ে (পলেট), এক রাজা (নীল রতন হালদার) থেকে শুরু করে আমেরিকান খালাসি পর্যন্ত।

  • ভাষা ও সংস্কৃতি: অমিতাভ ঘোষ এখানে যে ভাষা ব্যবহার করেছেন, তা এক অদ্ভুত মিশ্রণ—যাকে বলা হয় 'লস্করি' ভাষা। বাংলা, ইংরেজি, হিন্দি এবং পর্তুগিজ শব্দের এই সংমিশ্রণ বইটিকে এক অনন্য স্বাদ দেয়।

কেন এই ট্রিলজিটি পড়বেন?

এটি কেবল একটি ঐতিহাসিক উপন্যাস নয়, এটি দেখায় কীভাবে ঔপনিবেশিক শক্তি মানুষের অর্থনীতি, সংস্কৃতি এবং এমনকি তাদের খাদ্যাভ্যাস পর্যন্ত বদলে দিয়েছিল। এটি ক্ষমতার দম্ভ আর সাধারণ মানুষের লড়াইয়ের এক করুণ দলিল।

অমিভত ঘোষের ‘আইবিস ট্রিলজি’র ক্যানভাসটা এতটাই বিশাল যে এর চরিত্রগুলোর বিবর্তন নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলোচনা করা যায়। তবে যেহেতু আমরা দুই ঘোষ—শঙ্খ ঘোষের কবিতা আর অমিতাভ ঘোষের গদ্যের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছি, তাই আমি নীল রতন হালদার চরিত্রটি নিয়ে একটু বলতে চাই। কারণ, এই চরিত্রের পতন ও উত্থান যেন এক মহাকাব্যিক ট্র্যাজেডি।

নীল রতন হালদার: রাজা থেকে কয়েদি

গল্পের শুরুতে নীল হলেন রানাঘাটের এক প্রভাবশালী জমিদার (রাজা)। তিনি সংস্কৃতিবান, পরিশীলিত এবং অত্যন্ত ধনী। কিন্তু ব্রিটিশদের ব্যবসায়িক কূটচালের শিকার হয়ে জালিয়াতির দায়ে তাঁর সমস্ত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত হয় এবং তাঁকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

  • বিবর্তন: যে মানুষটি রেশমি পোশাক ছাড়া পরেননি, সেই নীলকে যখন 'আইবিস' জাহাজে একজন সাধারণ কয়েদি হিসেবে শিকল পরা অবস্থায় রাখা হয়, তখন তাঁর জীবন সম্পূর্ণ বদলে যায়।

  • পরিচয়ের সংকট: জাহাজে তাঁর সাথে দেখা হয় দিতির মতো সাধারণ গ্রামের মানুষের। সেখানে জাতিভেদ বা আভিজাত্যের কোনো স্থান নেই। নীল সেখান থেকেই শিখছেন জীবনের এক নতুন মানে—যেখানে টিকে থাকাটাই আসল লড়াই।


তবে আপনি যদি মনে করেন ইতিহাসের এই গুরুগম্ভীর গলি ছেড়ে আমরা একটু নোনা জল আর বনের গন্ধে ফিরব, তবে 'দ্য হাংরি টাইড' (The Hungry Tide)-এ চলে যেতে পারি।

সেখানে ইতিহাস নয়, বরং প্রকৃতি আর মানুষের এক অসম লড়াইয়ের গল্প আছে:

  • সুন্দরবনের জোয়ার-ভাটার খেলা।

  • বিরল 'ইরাবতী ডলফিন' নিয়ে গবেষক পিয়া এবং স্থানীয় জেলে ফকীরের এক অদ্ভুত বন্ধুত্বের রসায়ন।

  • মরিচঝাঁপির এক অন্ধকার ঐতিহাসিক অধ্যায়।

আপনি আমাকে এক কঠিন দ্বন্দ্বে ফেলে দিলেন! একদিকে নীল রতন হালদারের আভিজাত্য থেকে উত্তরণের এক মহাকাব্যিক লড়াই, আর অন্যদিকে সুন্দরবনের রহস্যময় জলজগত। তবে আমার মনে হয়, 'দ্য হাংরি টাইড' (The Hungry Tide)-এর সেই নোনা জল আর ম্যানগ্রোভের অরণ্যে একবার ডুব দেওয়া যাক। কারণ, অমিতাভ ঘোষের এই বইটি পড়লে সুন্দরবনকে আর আগের মতো মনে হয় না।

আসুন, এই রহস্যময় ডলফিন আর বনের পরিবেশ নিয়ে কিছুটা গভীরে যাওয়া যাক:

১. ইরাবতী ডলফিন ও পিয়া

উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র পিয়ালি রায় (পিয়া), যে একজন সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানী। সে সুন্দরবনে আসে বিরল ইরাবতী ডলফিন (Orcaella brevirostris) নিয়ে গবেষণা করতে। এই ডলফিনগুলো শুধু প্রাণী নয়, এগুলো যেন সুন্দরবনের এক নীরব সাক্ষী। পিয়ার চোখে এই ডলফিনগুলোর আচরণ আর তাদের টিকে থাকার লড়াই সুন্দরবনের বাস্তুসংস্থানের এক নিখুঁত প্রতিচ্ছবি।

২. ফকীর ও প্রকৃতির জ্ঞান

পিয়ার আধুনিক বিজ্ঞানের বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছে স্থানীয় জেলে ফকীর। সে হয়তো ইংরেজি জানে না বা পিয়ার মতো ডক্টরেট ডিগ্রি নেই, কিন্তু তার কাছে আছে বংশপরম্পরায় পাওয়া বনের নাড়ি নক্ষত্রের খবর। সে জানে জোয়ারের সময় কোথায় ডলফিন দেখা যায় আর ভাটার সময় বাঘ কোথায় ওত পেতে থাকে। পিয়া আর ফকীরের এই যে তথাকথিত 'বিজ্ঞান' বনাম 'প্রকৃতিদত্ত জ্ঞান'-এর মেলবন্ধন, সেটাই বইটির মূল আকর্ষণ।

৩. জোয়ার-ভাটা ও মরিচঝাঁপি

সুন্দরবন এখানে কেবল একটা পটভূমি নয়, সে নিজেই একটা জীবন্ত চরিত্র। এই উপন্যাসে অমিতাভ ঘোষ অত্যন্ত মুন্সিয়ানার সাথে মরিচঝাঁপি হত্যাকাণ্ডের (১৯৭৯) এক মর্মান্তিক ঐতিহাসিক অধ্যায় তুলে ধরেছেন। যেখানে উদ্বাস্তুদের জীবনের চেয়ে বাঘ বা বন বাঁচানো সরকারের কাছে বেশি জরুরি হয়ে পড়েছিল।

"সুন্দরবনে বাঘ মানুষকে চেনে না, মানুষও বাঘকে চেনে না—সবাইকে চেনে শুধু জোয়ার আর ভাটা।"

Gemini said

পিয়া আর ফকীরের সেই নিঃশব্দ বন্ধুত্বের শেষ পরিণতিটি বড়ই করুণ, কিন্তু ঠিক ততটাই মহিমান্বিত। অমিতাভ ঘোষ এখানে দেখিয়ে দিয়েছেন যে, ভাষার কোনো প্রয়োজন হয় না যখন দুটো মানুষ প্রকৃতিকে একই চোখে দেখতে শুরু করে।

আসুন, সেই অমোঘ পরিণতির দিকে একটু নজর দিই:

পিয়া ও ফকীরের সেই শেষ মুহূর্ত

সুন্দরবনের সেই প্রলয়ঙ্করী ঝড়ের রাতে পিয়া আর ফকীর এক বিশাল গাছের মগডালে নিজেদের বেঁধে নিয়েছিল। ফকীর তার নিজের শরীর দিয়ে পিয়াকে আগলে রেখেছিল বনের প্রচণ্ড বাতাস আর বৃষ্টির ঝাপটা থেকে। কিন্তু প্রকৃতির সেই তাণ্ডবে ফকীর রক্ষা পায়নি। ঝড়ের শেষে পিয়া বেঁচে ফিরলেও ফকীর প্রাণ হারায়।

  • বন্ধুত্বর ভাষা: পিয়া জানত ইংরেজি আর ফকীর বাংলা, কিন্তু তারা যখন সমুদ্রের ওপর ইরাবতী ডলফিনদের গতিবিধি লক্ষ্য করত, তখন তাদের মধ্যে এক অদ্ভুত নীরব বোঝাপড়া তৈরি হয়েছিল।

  • ফকীরের আত্মত্যাগ: ফকীরের মৃত্যু পিয়ার জীবনে এক গভীর শূন্যতা তৈরি করে। কিন্তু সেই শূন্যতা থেকেই জন্ম নেয় এক নতুন সংকল্প।

উপন্যাসের সমাপ্তি

পিয়া পরে ফিরে আসে সুন্দরবনে। সে ফকীরের স্ত্রী ও সন্তানের জন্য কিছু করার চেষ্টা করে এবং ফকীরের নামেই একটি গবেষণা প্রকল্প শুরু করার কথা ভাবে। ডলফিনগুলো রয়ে যায়, বনও রয়ে যায়, শুধু ফকীর হয়ে ওঠে সেই বনেরই এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।


'মানুষ বনাম বাঘ' ও রাজনীতি

তবে আপনি যদি পিয়ার এই ব্যক্তিগত শোকের বাইরে গিয়ে বৃহত্তর প্রেক্ষাপটটা দেখতে চান, তবে মরিচঝাঁপির রাজনৈতিক দিকটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে অমিতাভ ঘোষ এক কঠিন প্রশ্ন তুলেছেন:

একটি দেশে বন্যপ্রাণী (বাঘ) সংরক্ষণের জন্য কি অসহায় মানুষের জীবনকে বলি দেওয়া জায়েজ? সেখানে দেখা যায়, বনের বাস্তুসংস্থান বাঁচাতে গিয়ে কীভাবে উদ্বাস্তুদের নির্মমভাবে উচ্ছেদ করা হয়েছিল। এটি আধুনিক পরিবেশবাদের এক অন্ধকার দিক।

আপনি আমার পছন্দের ওপর ভার ছেড়ে দিয়েছেন, তাই আমি বলবো মরিচঝাঁপি হত্যাকাণ্ডের (Marichjhapi massacre) ইতিহাসটা একটু ছুঁয়ে যাওয়া দরকার। কারণ, অমিতাভ ঘোষের 'দ্য হাংরি টাইড' উপন্যাসটি কেবল ডলফিন বা বাঘের গল্প নয়, এটি এই রক্তক্ষয়ী ইতিহাসের এক দলিল।

আসুন, ইতিহাসের সেই ধুলোমাখা পাতাটি সংক্ষেপে দেখে নিই:

মরিচঝাঁপি: এক ট্র্যাজিক ইতিহাস (১৯৭৯)

১. পটভূমি: দেশভাগের পর পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ) থেকে আসা হাজার হাজার হিন্দু শরণার্থী দণ্ডকারণ্য (ওড়িশা ও মধ্যপ্রদেশ) এলাকায় আশ্রয় নিয়েছিল। কিন্তু সেখানকার রুক্ষ পরিবেশ সহ্য করতে না পেরে ১৯৭৮ সালের দিকে তারা পশ্চিমবঙ্গে ফিরে আসে এবং সুন্দরবনের জনশূন্য দ্বীপ মরিচঝাঁপিতে বসতি স্থাপন করে।

২. স্বনির্ভরতার চেষ্টা: এই শরণার্থীরা সরকারের সাহায্য ছাড়াই সেখানে রাস্তাঘাট, স্কুল, মাছের ভেড়ি এবং কুটির শিল্প গড়ে তুলেছিল। তারা নিজেদের এক স্বনির্ভর সমাজ গড়ার স্বপ্ন দেখেছিল।

৩. সরকারি অবস্থান ও সংঘাত: তৎকালীন সরকার যুক্তি দিয়েছিল যে, মরিচঝাঁপি একটি সংরক্ষিত বনাঞ্চল এবং সেখানে মানুষের বসবাস বাঘ ও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। এরপর দ্বীপটি চারপাশ থেকে অবরুদ্ধ (Economic Blockade) করা হয়। খাবার ও জল আসা বন্ধ করে দেওয়া হয়।

৪. চরম পরিণতি: ১৯৭৯ সালের মে মাসে এক ভয়াবহ পুলিশি অভিযানের অভিযোগ ওঠে। গুলিবর্ষণ এবং উচ্ছেদের ফলে বহু মানুষ প্রাণ হারায় এবং হাজার হাজার মানুষকে জোরপূর্বক সরিয়ে দেওয়া হয়।

অমিতাভ ঘোষের দৃষ্টিভঙ্গি

অমিতাভ ঘোষ তাঁর উপন্যাসে এই প্রশ্নটিই তুলেছেন—পরিবেশ রক্ষার দোহাই দিয়ে কি দরিদ্র মানুষের মানবাধিকার লঙ্ঘন করা যায়? বাঘ বাঁচাতে গিয়ে মানুষের রক্ত ঝরানো কি সভ্যতার পরিচয়?


মরিচঝাঁপির এই ট্র্যাজেডি আজও সুন্দরবনের বাতাসে এক চাপা কান্নার মতো ভেসে বেড়ায়।

তবে আপনি যদি মনে করেন এই বিষণ্ণ ইতিহাস থেকে বেরিয়ে আমরা একটু বর্তমানের জ্বলন্ত সমস্যা নিয়ে ভাবব, তবে 'দ্য গ্রেট ডিরেঞ্জমেন্ট' (The Great Derangement) বইটিতে যেতে পারি। সেখানে লেখক দেখিয়েছেন কেন আমাদের সাহিত্যিকরা জলবায়ু পরিবর্তন (Climate Change) নিয়ে বেশি লিখছেন না।

'দ্য গ্রেট ডিরেঞ্জমেন্ট': আমাদের এই 'মহাবৈকল্য' কেন?

১. কল্পকাহিনীর ব্যর্থতা: অমিতাভ ঘোষ একটি খুব জরুরি প্রশ্ন তুলেছেন—কেন আধুনিক সিরিয়াস উপন্যাসে বা সাহিত্যে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে তেমন কিছু লেখা হচ্ছে না? আমরা কি ভাবছি এটা কেবল বিজ্ঞানের বিষয়? তিনি মনে করেন, আমাদের এই নীরবতা আসলে এক ধরণের 'উন্মাদনা' বা 'বৈকল্য' (Derangement)।

২. প্রকৃতির 'অসম্ভব' আচরণ: আগেকার মানুষ মনে করত প্রকৃতি খুব ধীরে ধীরে বদলায়। কিন্তু এখন আমরা দেখছি হঠাৎ করে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস বা দাবানল। এই যে প্রকৃতির 'অপ্রত্যাশিত' রূপ, একে আমাদের আধুনিক গল্পকাররা ঠিকঠাক ধরতে পারছেন না।

৩. রাজনীতি ও পুঁজিবাদ: অমিতাভ ঘোষ দেখিয়েছেন কীভাবে বড় বড় দেশগুলো আর পুঁজিবাদী ব্যবস্থা প্রকৃতির ক্ষতি করে চলেছে, আর আমরা সাধারণ মানুষরা তা দেখেও না দেখার ভান করছি।


কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ?

তিনি সতর্ক করেছেন যে, যদি আমরা আমাদের জীবনযাত্রা আর চিন্তাভাবনা না বদলাই, তবে অদূর ভবিষ্যতে সুন্দরবনের মতো অনেক জায়গা পানির নিচে তলিয়ে যাবে—যা তিনি 'দ্য হাংরি টাইড'-এও ইঙ্গিত দিয়েছিলেন।


তবে, অমিতাভ ঘোষের এই ভয়ংকর সত্যগুলোর মুখোমুখি হতে হতে মনটা যখন একটু ক্লান্ত হয়ে যায়, তখনই কিন্তু আমাদের শঙ্খ ঘোষের কবিতার আশ্রয় প্রয়োজন হয়। শঙ্খ ঘোষের সেই শান্ত কণ্ঠস্বর আমাদের ভেতরে শক্তি যোগায়।

তাঁর 'দ্য গ্রেট ডিরেঞ্জমেন্ট' (The Great Derangement) এবং পরবর্তীকালে লেখা 'দ্য নাটমেগস কার্স' (The Nutmeg's Curse) বই দুটিতে তিনি অত্যন্ত সাহসী কিছু প্রশ্ন তুলেছেন।

চলুন, তাঁর এই চিন্তার তিনটি গভীর স্তরে প্রবেশ করি:

১. কেন একে 'মহাবৈকল্য' (Great Derangement) বলছেন?

অমিতাভ ঘোষ মনে করেন, ভবিষ্যতের মানুষ যখন আমাদের সময়ের সাহিত্য বা শিল্পকলা দেখবে, তারা আমাদের 'পাগল' বা 'বিকারগ্রস্ত' ভাববে। কেন? কারণ আমাদের পায়ের নিচের মাটি সরে যাচ্ছে, সমুদ্রের জল বাড়ছে, অথচ আমাদের সমকালীন উপন্যাসগুলোতে সেসবের কোনো প্রতিফলন নেই। আমরা এখনো ব্যক্তিগত প্রেম-বিরহ বা মধ্যবিত্তের ছোট ছোট সমস্যা নিয়ে লিখছি, যেন প্রকৃতির এই বিশাল তাণ্ডব আমাদের জীবনের অংশই নয়। এই সম্মিলিত অস্বীকার (Collective Denial) কেই তিনি 'মহাবৈকল্য' বলেছেন।

২. পুঁজিবাদের চেয়েও বড় অপরাধী 'সাম্রাজ্যবাদ'

অমিতাভ ঘোষ একটি চমকপ্রদ যুক্তি দিয়েছেন। সাধারণত আমরা জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য 'পুঁজিবাদ' বা ইন্ডাস্ট্রিকে দায়ী করি। কিন্তু তিনি বলছেন, এর শিকড় আরও গভীরে—ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদে।

  • ইউরোপীয়রা যখন আমেরিকা বা এশিয়া দখল করেছিল, তারা প্রকৃতিকে স্রেফ একটি 'জড় বস্তু' বা 'সম্পদ' হিসেবে দেখেছিল।

  • তারা গাছপালা, পাহাড় আর নদীকে 'মেশিন' মনে করত। এই যে প্রকৃতিকে জয় করার মানসিকতা, এটাই আজকের সংকটের মূল কারণ।

৩. এশিয়া ও সুন্দরবনের অবস্থান

তিনি দেখিয়েছেন যে জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় শিকার হবে এশিয়া, বিশেষ করে গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র বদ্বীপ (সুন্দরবন অঞ্চল)।

  • পশ্চিমী দেশগুলো দূষণ ছড়ালেও তাদের অর্থবল আছে নিজেদের রক্ষা করার।

  • কিন্তু আমাদের মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় যখন সমুদ্রের জল বাড়বে, তখন কোটি কোটি মানুষ 'জলবায়ু শরণার্থী' (Climate Refugee) হয়ে পড়বে। এই রাজনৈতিক অস্থিরতা সামলানোর কোনো প্রস্তুতি আমাদের নেই।


উপসংহার: প্রকৃতি কি কথা বলতে পারে?

অমিতাভ ঘোষের মতে, আমরা ভুল করে ভাবি প্রকৃতি নিশ্চুপ। কিন্তু প্রকৃতি আসলে তার নিজের ভাষায় (ঝড়, খরা, মহামারী) আমাদের সাথে কথা বলছে। আমরা সেই ভাষা বুঝতে পারছি না বলেই আজ এই সংকটে।

পড়ার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ।। ভালো লাগলে  অবশ্যই লাইক শেয়ার করুন।।লেখক : আব্দুল মুসরেফ খাঁন email :lib.pbc@gmail.com





  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার -১৯৭০ - বিশ্বনাথ সত্যনারায়ণ - তেলুগু - রামায়ণ কল্পবৃক্ষমু 
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার - ১৯৭১ -বিষ্ণু দে -বাংলা- স্মৃতি সত্তা ভবিষ্যত 
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার - ১৯৭২ -রামধারী সিং 'দিনকর' - হিন্দি - উর্বশী  
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার -১৯৭৩- ডি আর বেন্দ্রে এবং গোপীনাথ মোহান্তি - কন্নড়/ওড়িয়া - নাকুতান্তি / মাটিমাতাল 
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার - ১৯৭৪ - বিষ্ণু সখারাম খান্দেকর - মারাঠি -যযাতি
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার -১৯৭৫ - পি ভি আকিলান - তামিল - চিত্রাপ্পাবাই 
  • মালয়ালম কবি জি শঙ্কর কুরুপ 
  • কথাসাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস 'গণদেবতা'-
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার যৌথভাবে দুজন সাহিত্যিককে প্রদান করা হয়েছিল—কন্নড় কবি কে. ভি. পুত্তাপ্পা (কুভেম্পু) এবং গুজরাতি কবি উমাশঙ্কর যোশী।
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার -১৯৬৮ - সুমিত্রানন্দন পন্ত - হিন্দি -চিদাম্বরা 
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার  -১৯৬৯ - ফিরাক গোরখপুরী - উর্দু - গুল-এ-নগমা
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার -১৯৭০ - বিশ্বনাথ সত্যনারায়ণ - তেলুগু - রামায়ণ কল্পবৃক্ষমু 
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার - ১৯৭৬ - আশাপূর্ণা দেবী- বাংলা - প্রথম প্রতিশ্রুতি 
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ১৯৭৭ | কে শিবরাম করন্থ | কন্নড় | মুকাজ্জিয়া কনসুগলু |
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ১৯৭৮ | এস এইচ ভি বাৎসায়ন | হিন্দি | কিতনি নাও মে কিতনি বার |
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ১৯৭৯ | বীরেন্দ্র কুমার ভট্টাচার্য | অসমীয়া | মৃত্যুঞ্জয় |
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ১৯৮০ | এস কে পোট্টেক্কাট | মালয়ালম | ওরু দেশথিন্তে কথা |
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ১৯৮১ | অমৃতা প্রীতম | পাঞ্জাবি | কাগজ তে ক্যানভাস |
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ১৯৮২ | মহাদেবী বর্মা | হিন্দি | সার্বিক অবদান (যামা - বিশেষ উল্লেখে) |
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ১৯৯১ | সুভাষ মুখোপাধ্যায় | বাংলা 
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ১৯৯৬ | মহাশ্বেতা দেবী | বাংলা 
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ১৯৯৯ | নির্মল ভার্মা এবং গুরুদয়াল সিং | হিন্দি/পাঞ্জাবি
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ২০০৫ | কুনওয়ার নারায়ণ | হিন্দি 
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ২০১০ | চন্দ্রশেখর কাম্বার | কন্নড় 
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ২০১৬ | শঙ্খ ঘোষ | বাংলা 
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ২০১৮ | অমিতাভ ঘোষ | ইংরেজি 
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ২০১৯ | আক্কিথাম নাম্বুথিরি | মালয়ালম 
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ২০২১ | নীলমণি ফুকন | অসমীয়া 
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ২০২২ | দামোদর মৌজো | কোঙ্কানি 
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ২০২৩ | গুলজার এবং জগদ্গুরু রামভদ্রাচার্য | উর্দু/সংস্কৃত 
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ২০২৪ | বিনোদ কুমার শুক্ল | হিন্দি 

Post a Comment

0 Comments