সাহিত্যে অশ্লীলতা বনাম বাস্তবতা : বুদ্ধদেব বসুর 'রাত ভ’রে বৃষ্টি': এই উপন্যাসের বিরুদ্ধে অশ্লীলতার দায়ে মামলা হয়েছিল?
সাহিত্যে অশ্লীলতা বনাম বাস্তবতা—এই বিতর্কটি চিরন্তন। বিশেষ করে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে বুদ্ধদেব বসুর 'রাত ভ’রে বৃষ্টি' (১৯৬৭) একটি মাইলফলক, যা এই বিতর্ককে আদালতের কাঠগড়া পর্যন্ত নিয়ে গিয়েছিল।
এই উপন্যাসের প্রেক্ষাপটে অশ্লীলতা ও বাস্তবতার দ্বন্দ্বকে কয়েকটি আঙ্গিকে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে:
১. 'রাত ভ’রে বৃষ্টি' ও অশ্লীলতার অভিযোগ
উপন্যাসটি প্রকাশিত হওয়ার পর তৎকালীন সমাজে তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি হয়। মধ্যবিত্ত দাম্পত্য জীবনের যৌনতা, পরকীয়া এবং অবদমিত কামনার খোলামেলা বর্ণনার কারণে ১৯৬৭ সালে এর বিরুদ্ধে অশ্লীলতার দায়ে মামলা দায়ের করা হয়। তৎকালীন ভারতীয় দণ্ডবিধির ২৯২ ধারায় এটি নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েছিল। যদিও দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর ১৯৭৩ সালে উচ্চ আদালত এই উপন্যাসকে অশ্লীলতার দায় থেকে মুক্তি দেয়।
২. বাস্তবতা বনাম অশ্লীলতার সূক্ষ্ম রেখা
সাহিত্যে যখন কোনো সত্যকে নগ্নভাবে প্রকাশ করা হয়, তখন রক্ষণশীল সমাজ তাকে 'অশ্লীল' তকমা দেয়। কিন্তু বুদ্ধদেব বসুর যুক্তি ছিল অন্যরকম:
ভেতরের সত্য: 'রাত ভ’রে বৃষ্টি' উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র অংশুমান ও মালতীর দাম্পত্য জীবনের ফাটল কোনো কাল্পনিক বিকৃতি নয়, বরং আধুনিক নাগরিক জীবনের এক রূঢ় বাস্তবতা।
মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ: লেখক এখানে শরীরকে শুধু কামনার বস্তু হিসেবে নয়, বরং মানুষের নিঃসঙ্গতা ও অতৃপ্তির এক মাধ্যম হিসেবে দেখিয়েছেন। সাহিত্য যখন মানুষের অবদমিত সত্যকে তুলে ধরে, তখন তা আর স্রেফ 'অশ্লীলতা' থাকে না, তা হয়ে ওঠে 'শিল্পিত বাস্তবতা'।
৩. শিল্পের স্বায়ত্তশাসন
বুদ্ধদেব বসু বিশ্বাস করতেন, শিল্পের বিচার হবে শিল্পের মাপকাঠিতে, প্রচলিত নৈতিকতার মাপকাঠিতে নয়। তার মতে:
সাহিত্যের উদ্দেশ্য কেবল আনন্দ দেওয়া নয়, বরং মানুষের অস্তিত্বের জটিলতাকে উন্মোচন করা।
যদি কোনো বর্ণনা গল্পের খাতিরে বা চরিত্রের মনস্তত্ত্ব বোঝাতে অনিবার্য হয়, তবে তাকে অশ্লীল বলা শিল্পের অবমাননা।
৪. ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও উত্তরণ
বাংলা সাহিত্যে কেবল বুদ্ধদেব বসু নন, এর আগে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'পুতুলনাচের ইতিকথা' বা জগদীশ গুপ্তের লেখনী নিয়েও বিতর্ক হয়েছে। পরবর্তীতে 'প্রজাপতি' (সমরেশ বসু) উপন্যাস নিয়ে মামলাও এই একই ধারার অংশ। আদালত শেষ পর্যন্ত মেনে নেয় যে, যৌনতা জীবনের অংশ, তাই তা সাহিত্যেরও অংশ হতে পারে—যদি তার উপস্থাপনা শৈল্পিক হয়।
উপসংহার
'রাত ভ’রে বৃষ্টি' কেবল একটি নিষিদ্ধ বা বিতর্কিত উপন্যাস নয়, এটি বাংলা সাহিত্যে বাক-স্বাধীনতার এক জয়ের স্মারক। বুদ্ধদেব বসু প্রমাণ করেছেন যে, সাহিত্যিকের কাজ সমাজের ‘নীতি পুলিশ’ হওয়া নয়, বরং মানুষের মনের অন্ধকার গলিপথগুলোতে আলো ফেলা।
'রাত ভ'রে বৃষ্টি' উপন্যাসের আইনি লড়াই এবং বুদ্ধদেব বসুর নিজস্ব অবস্থান বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এই মামলাটি কেবল একটি বইয়ের ভাগ্য নির্ধারণ করেনি, বরং সাহিত্যে "অশ্লীলতা" (Obscenity) সংজ্ঞায়িত করার ক্ষেত্রে একটি আইনি নজির স্থাপন করেছিল।
নিচে এই লড়াইয়ের বিস্তারিত রায়ের প্রেক্ষাপট এবং বুদ্ধদেব বসুর যুক্তিগুলো তুলে ধরা হলো:
১. নিম্ন আদালতের রায় (১৯৭০)
কলকাতার প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে যখন মামলাটি চলে, তখন বিচারক উপন্যাসটিকে অশ্লীল বলে ঘোষণা করেন। আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছিল:
উপন্যাসে বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্কের (পরকীয়া) যে চিত্রায়ন রয়েছে, তা সমাজের নৈতিক অবক্ষয় ঘটাতে পারে।
যৌনতার বর্ণনাগুলো শিল্পের প্রয়োজনে নয়, বরং পাঠকদের "নিম্নরুচি" চরিতার্থ করার জন্য দেওয়া হয়েছে।
ফলস্বরূপ, বইটির সমস্ত কপি বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয় এবং বুদ্ধদেব বসুকে প্রতীকী জরিমানা করা হয়।
২. বুদ্ধদেব বসুর আত্মপক্ষ সমর্থন ও যুক্তি
বুদ্ধদেব বসু এই মামলাকে ব্যক্তিগত আক্রমণ হিসেবে না দেখে শিল্পের স্বাধীনতার লড়াই হিসেবে দেখেছিলেন। তার প্রধান যুক্তিগুলো ছিল:
সত্যের অপলাপ নয়: তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন যে, মধ্যবিত্ত জীবনের যে অতৃপ্তি এবং দাম্পত্য সংকটের কথা তিনি লিখেছেন, তা সমাজের একটি রূঢ় সত্য। লেখক হিসেবে সেই সত্যকে আড়াল করা তার কাজ নয়।
ভিক্টোরীয় নীতিবোধের বিরোধিতা: তিনি বিশ্বাস করতেন, ১৯ শতকের ব্রিটিশ নীতিবোধ দিয়ে ২০ শতকের আধুনিক সাহিত্য বিচার করা অসম্ভব। শরীর ও মনের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য, তাই শরীরকে বাদ দিয়ে মনের হদিস পাওয়া যায় না।
শিল্পের সার্বভৌমত্ব: তিনি বারবার বলেছিলেন যে, কোনো রচনার অশ্লীলতা বিচার করতে হবে তার সামগ্রিক প্রভাব (Total Effect) দিয়ে, বিচ্ছিন্ন কোনো অনুচ্ছেদ বা শব্দ দিয়ে নয়।
৩. উচ্চ আদালতের ঐতিহাসিক রায় (১৯৭৩)
নিম্ন আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে কলকাতা হাইকোর্টে আপিল করা হয়। বিচারপতি অমিয় কুমার মুখোপাধ্যায় এক ঐতিহাসিক রায় প্রদান করেন, যা আজও স্মরণীয়:
অশ্লীলতার সংজ্ঞা পুনর্মূল্যায়ন: আদালত জানায়, কোনো বইয়ে যৌনতার বর্ণনা থাকলেই তা অশ্লীল নয়। যদি সেই বর্ণনা গল্পের বিষয়ের সাথে সংগতিপূর্ণ হয় এবং শিল্পের খাতিরে প্রয়োজনীয় হয়, তবে তা গ্রহণযোগ্য।
হিকলিন টেস্ট (Hicklin Test) এর সীমাবদ্ধতা: আদালত লক্ষ্য করে যে, আধুনিক যুগে মানুষের চিন্তাধারার পরিবর্তন ঘটেছে। যা আগে 'উত্তেজক' মনে হতো, আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাসে তা জীবনের অংশ হিসেবেই বিবেচিত।
মুক্তি: আদালত 'রাত ভ'রে বৃষ্টি'র ওপর থেকে সমস্ত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয় এবং বুদ্ধদেব বসুকে সসম্মানে খালাস দেয়।
এই লড়াইয়ের প্রভাব
এই রায়ের পর বাংলা সাহিত্যে এক নতুন যুগের সূচনা হয়। এটি প্রমাণ করে যে:
সাহিত্যিকের কল্পনাশক্তিকে আইনের শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা যায় না।
সমাজের তথাকথিত নৈতিকতা আর সাহিত্যের নন্দনতত্ত্ব এক নয়।
বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্ক বা যৌনতা নিয়ে খোলাখুলি আলোচনা মানেই তা সমাজবিরোধী নয়, বরং তা জীবনেরই এক জটিল মনস্তত্ত্ব।
বুদ্ধদেব বসুর ঠিক পরেই বাংলা সাহিত্যে অশ্লীলতার অভিযোগে সবথেকে বড় আইনি লড়াই লড়েছিলেন সমরেশ বসু। তাঁর দুটি উপন্যাস—'বিবর' এবং 'প্রজাপতি'—কে কেন্দ্র করে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, তা ভারতীয় সাহিত্য ও আইনের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়।
বিশেষ করে 'প্রজাপতি' উপন্যাসটির মামলা নিম্ন আদালত থেকে শুরু করে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়িয়েছিল। নিচে এর বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. সমরেশ বসুর 'বিবর' ও 'প্রজাপতি'
১৯৬০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে 'বিবর' প্রকাশিত হলে সাহিত্যিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। এরপর ১৯৬৭ সালে (যে বছর 'রাত ভ’রে বৃষ্টি' প্রকাশিত হয়) 'দেশ' পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয় 'প্রজাপতি'।
অভিযোগ: এই উপন্যাসে ব্যবহৃত ভাষা, যৌনতার বর্ণনা এবং সমাজের তথাকথিত নৈতিক অবক্ষয়ের চিত্রায়নকে 'অশ্লীল' বলে চিহ্নিত করা হয়।
মামলা: বুদ্ধদেব বসুর মতো সমরেশ বসুর বিরুদ্ধেও ভারতীয় দণ্ডবিধির ২৯২ ধারায় মামলা করা হয়।
২. আইনি লড়াই ও সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায় (১৯৮৫)
'প্রজাপতি' নিয়ে আইনি যুদ্ধ দীর্ঘ ১৭ বছর চলেছিল। নিম্ন আদালত এবং কলকাতা হাইকোর্ট উপন্যাসটিকে 'অশ্লীল' বলে রায় দিলেও, সমরেশ বসু হাল ছাড়েননি। অবশেষে ১৯৮৫ সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট এক যুগান্তকারী রায় দেয়:
বিচারপতিদের পর্যবেক্ষণ: সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি আর. এস. পাঠক এবং অমरेन्द्र নাথ সেন রায় দেন যে, কোনো বইয়ের কয়েকটি বিচ্ছিন্ন অংশ বা শব্দ দিয়ে তার অশ্লীলতা বিচার করা যাবে না।
সাহিত্যের মানদণ্ড: রায়ে বলা হয়, একজন লেখকের কাজ সমাজকে কেবল আদর্শ ললিপপ দেখানো নয়, বরং সমাজের অন্ধকার দিকগুলোকেও তুলে ধরা। 'প্রজাপতি' উপন্যাসের ভাষা হয়তো রূঢ়, কিন্তু তা গল্পের চরিত্রের প্রয়োজনেই ব্যবহৃত হয়েছে।
ফলাফল: সুপ্রিম কোর্ট হাইকোর্টের রায় বাতিল করে দেয় এবং 'প্রজাপতি'কে অশ্লীলতার দায় থেকে মুক্তি দেয়। এই রায়টি আজও ভারতে 'বাক-স্বাধীনতা' ও 'শৈল্পিক স্বাধীনতার' প্রধান ঢাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
৩. অন্যান্য বিতর্কিত সাহিত্যিক ও সৃষ্টি
বুদ্ধদেব বসু ও সমরেশ বসু ছাড়াও আরও কয়েকজন লেখকের কাজ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিতর্ক হয়েছে:
|
সাহিত্যিক |
বিতর্কিত কাজ |
বিতর্কের কারণ |
|
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় |
পুতুলনাচের ইতিকথা |
কুসুম ও শশীর সম্পর্কের জটিলতা ও যৌন অবদমন তৎকালীন পাঠকদের একাংশ গ্রহণ করতে পারেনি। |
|
সৈয়দ মুজতবা আলী |
চতুরঙ্গ (প্রবন্ধ/গল্প) |
ধর্মীয় ও সামাজিক রক্ষণশীলতার বিরুদ্ধে তাঁর তীক্ষ্ণ শ্লেষ অনেক সময় বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল। |
|
তসলিমা নাসরিন |
লজ্জা, আমার মেয়েবেলা |
ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত এবং অতি-সাহসী আত্মজীবনীর কারণে তাঁর বই নিষিদ্ধ হয় এবং তিনি নির্বাসিত হন। |
৪. অশ্লীলতা বনাম শিল্পের পার্থক্য কী?
এই মামলাগুলোর রায়ে আদালত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করে দিয়েছে:
উদ্দেশ্য (Intention): লেখকের উদ্দেশ্য যদি কেবল কামোদ্রেক করা হয়, তবে তা অশ্লীল। কিন্তু যদি উদ্দেশ্য হয় সমাজের কোনো সত্য উন্মোচন করা, তবে তা শিল্প।
সামগ্রিকতা (Totality): একটি বইয়ের একটি পাতা অশ্লীল হতে পারে না যদি পুরো বইটি একটি মহৎ উদ্দেশ্যে লেখা হয়।
পরিবর্তনশীল রুচি: ১৯২০ সালে যা অশ্লীল ছিল, ১৯৮০ বা ২০২৪ সালে তা বাস্তবতা হিসেবে গণ্য হতে পারে।
সমরেশ বসু একবার বলেছিলেন, "আমি যা দেখি, যা অনুভব করি, তাই লিখি। সমাজ যদি পচে গিয়ে থাকে, তবে আমার লেখায় সেই পচনের গন্ধই আসবে।"

0 Comments