মহাভারতের বনপর্ব : ঋষিদের বর্ণিত বিখ্যাত উপাখ্যান : মৎস্য অবতারের কাহিনী: মনু ও প্রলয়কালে মৎস্য রূপী বিষ্ণুর কাহিনী

 


মহাভারতের বনপর্ব : ঋষিদের বর্ণিত বিখ্যাত উপাখ্যান :  মৎস্য অবতারের কাহিনী: মনু ও প্রলয়কালে মৎস্য রূপী বিষ্ণুর কাহিনী

মহাভারতের বনপর্বে পাণ্ডবদের বনবাস চলাকালীন মহর্ষি মার্কণ্ডেয় যুধিষ্ঠিরকে এই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ 'মৎস্য অবতারের' কাহিনীটি শুনিয়েছিলেন এটি সৃষ্টির ধ্বংস এবং পুনর্জন্মের এক চিরন্তন আখ্যান

নিচে মৎস্য অবতার বৈবস্বত মনুর সেই কাহিনীটি সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো:

. মনুর কঠোর তপস্যা

সূর্যপুত্র বৈবস্বত মনু ছিলেন অত্যন্ত ধর্মপরায়ণ জিতেন্দ্রিয় একজন ঋষি তিনি যখন নদীর তীরে কঠোর তপস্যা করছিলেন, তখন একদিন তর্পণ করার সময় তাঁর অঞ্জলিতে একটি অতি ক্ষুদ্র মাছ উঠে আসে

. মাছের জীবন রক্ষা বৃদ্ধি

ক্ষুদ্র মাছটি মনুর কাছে জীবন ভিক্ষা চায় এবং জানায় যে বড় মাছেরা তাকে খেয়ে ফেলবে দয়াপরবশ হয়ে মনু মাছটিকে একটি মাটির পাত্রে রাখেন কিন্তু অলৌকিকভাবে মাছটি এত দ্রুত বাড়তে থাকে যে:

মাটির পাত্র থেকে তাকে কুয়োতে স্থানান্তর করতে হয়

কুয়ো থেকে তাকে সরোবরে নিয়ে যেতে হয়

শেষে সরোবরেও জায়গা না হওয়ায় মনু তাকে গঙ্গা নদীতে এবং পরবর্তীতে সমুদ্রে বিসর্জন দেন

বিশাল আকার ধারণ করা সেই মৎস্য তখন মনুকে সতর্ক করে দেন যে, অতি শীঘ্রই এক মহাপ্রলয় আসতে চলেছে যা সমগ্র সৃষ্টিকে ধ্বংস করে দেবে

. প্রলয়ের প্রস্তুতি নৌকা নির্মাণ

মৎস্যের নির্দেশ অনুযায়ী মনু একটি বিশাল শক্তিশালী নৌকা নির্মাণ করেন মৎস্য মনুকে আদেশ দেন:

নৌকায় সপ্তর্ষিদের (কশ্যপ, অত্রি, বশিষ্ঠ, বিশ্বামিত্র, গৌতম, জমদগ্নি ভরদ্বাজ) আরোহণ করাতে

পৃথিবীর সমস্ত উদ্ভিদের বীজ সংগ্রহ করে সযত্নে নৌকায় তুলে রাখতে

. মহাপ্রলয় মৎস্যের রক্ষা

নির্দিষ্ট সময়ে প্রলয় শুরু হয় আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামে এবং সমুদ্রের জল উপচে সমস্ত পৃথিবী প্লাবিত করে চারিদিকে শুধু জল আর জল, কোনো স্থলভাগ অবশিষ্ট থাকে না

এই সময় মৎস্য রূপী ভগবান বিষ্ণু আবির্ভূত হন তাঁর মাথায় একটি বিশাল শৃঙ্গ (শিং) ছিল মনু পূর্ব নির্দেশিত 'নাগপাশ' বা শক্তিশালী রশি দিয়ে নৌকাটিকে সেই মাছের শৃঙ্গের সাথে বেঁধে দেন উত্তাল সমুদ্রে মৎস্য সেই নৌকাটিকে টেনে নিয়ে দীর্ঘকাল ধরে চলতে থাকেন

. নতুন সৃষ্টির সূচনা

অবশেষে মৎস্য নৌকাটিকে হিমালয়ের সর্বোচ্চ শিখরে নিয়ে যান এবং মনুকে নির্দেশ দেন নৌকাটি পাহাড়ের চূড়ার সাথে বেঁধে রাখতে (এই স্থানটি 'নৌবন্ধন' নামে পরিচিত) যখন বন্যার জল নেমে যায়, তখন মৎস্য নিজের প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ করেন এবং জানান যে তিনিই ব্রহ্মা/বিষ্ণু তিনি মনুকে পুনরায় নতুন জগৎ সৃষ্টি করার এবং ধর্ম স্থাপনের আশীর্বাদ দেন

কাহিনীর মূল শিক্ষা

এই উপাখ্যানটি আমাদের শেখায় যে, চরম সংকটের সময় ধৈর্য এবং ঈশ্বরভক্তিই মানুষকে রক্ষা করে এটি সৃষ্টির ধ্বংস পুনর্নির্মাণের একটি চক্রাকার আবর্তনকে তুলে ধরে

 

Post a Comment

0 Comments