মহাভারতের স্ত্রীপর্ব

 


মহাভারতের স্ত্রীপর্ব

মহাভারতের স্ত্রীপর্ব মূলত কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের পরবর্তী হাহাকার এবং নারীদের শোকের চিত্র এখানে গান্ধারী এবং কুন্তীর শোকপ্রকাশের মূল কাহিনীগুলো নিচে তালিকার মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:

. গান্ধারীর শোক বিলাপ

যুদ্ধের পর ধৃতরাষ্ট্র এবং গান্ধারী কুরুক্ষেত্রে উপস্থিত হন। সেখানে গান্ধারী ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সাহায্যে দিব্যচক্ষু লাভ করেন এবং রণক্ষেত্রের বীভৎস দৃশ্য দেখে শোকে ভেঙে পড়েন

·         পুত্রশোকে বিলাপ: গান্ধারী তাঁর ১০০ পুত্রের (বিশেষ করে দুর্যোধন দুঃশাসনের) ছিন্নভিন্ন দেহ দেখে চরম আর্তনাদ করেন

·         বৌদের করুণ অবস্থা: রাজবধূদের অলঙ্কারহীন, আলুলায়িত কেশে রণক্ষেত্রে মৃত স্বামীদের দেহ খুঁজে বেড়ানোর দৃশ্য গান্ধারীকে ব্যথিত করে

·         অন্যান্য বীরদের মৃত্যু: কর্ণ, দ্রোণাচার্য, এবং ভীষ্মের মতো মহাবীরদের পতনেও তিনি গভীর শোক প্রকাশ করেন

·         শ্রীকৃষ্ণকে অভিশাপ: নিজের সন্তানদের এই করুণ পরিণতির জন্য তিনি শ্রীকৃষ্ণকে দায়ী করেন। তিনি মনে করেন কৃষ্ণ চাইলে এই যুদ্ধ থামাতে পারতেন। ক্রোধ শোকে তিনি যদুবংশ ধ্বংসের অভিশাপ দেন


. কুন্তীর শোক গোপন তথ্য প্রকাশ

কুন্তী পাণ্ডবদের মাতা হলেও তাঁর শোকের ধরণ ছিল অত্যন্ত বেদনাবিধুর এবং তাতে ছিল এক গভীর অনুশোচনা

·         মৃতদের তর্পণ: যুদ্ধ শেষে যখন যুধিষ্ঠির মৃত আত্মীয়-স্বজনদের তর্পণ (জলদান) করছিলেন, তখন কুন্তী সেখানে আসেন

·         কর্ণের পরিচয় দান: কুন্তী অত্যন্ত ভারাক্রান্ত হৃদয়ে পাণ্ডবদের জানান যে, যাকে তারা সারাজীবন 'সূতপুত্র' বলে ঘৃণা করেছে এবং যুদ্ধে হত্যা করেছে, সেই কর্ণ আসলে তাঁদের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা

·         অনুশোচনা: কুন্তী বিলাপ করে বলেন যে, তাঁর ভুলের কারণেই ভাইয়ে ভাইয়ে এই যুদ্ধ হয়েছে এবং কর্ণকে নিজের পরিচয় গোপন রেখে মরতে হয়েছে


. যুধিষ্ঠিরের শোক অভিশাপ

কুন্তীর এই স্বীকারোক্তি পাণ্ডবদের মধ্যে, বিশেষ করে যুধিষ্ঠিরের মনে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করে:

·         ভ্রাতৃহত্যার গ্লানি: জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা কর্ণকে না জেনে হত্যা করার অপরাধে যুধিষ্ঠির গভীর শোকে নিমজ্জিত হন

·         নারী জাতিকে অভিশাপ: এই শোক থেকে রাগান্বিত হয়ে যুধিষ্ঠির সমগ্র নারী জাতিকে অভিশাপ দেন যে"আজ থেকে নারীরা কোনো গোপন কথা লুকিয়ে রাখতে পারবে না।"


সারসংক্ষেপ তালিকা:

চরিত্র

শোকের মূল কারণ

বিশেষ ঘটনা

গান্ধারী

১০০ পুত্রের মৃত্যু বংশনাশ

শ্রীকৃষ্ণকে অভিশাপ প্রদান

কুন্তী

কর্ণের মৃত্যু গোপন পাপবোধ

কর্ণের প্রকৃত পরিচয় পাণ্ডবদের কাছে প্রকাশ

যুধিষ্ঠির

না জেনে বড় ভাইকে হত্যা করা

নারী জাতিকে গোপন কথা না রাখার অভিশাপ


মহাভারতের স্ত্রীপর্বে গান্ধারী যখন তাঁর ১০০ পুত্রের মৃতদেহ রণক্ষেত্রে পড়ে থাকতে দেখেন, তখন তাঁর শোক ক্রোধে পরিণত হয় তিনি এই মহাধ্বংসের জন্য শ্রীকৃষ্ণকে দায়ী করেন, কারণ কৃষ্ণ সর্বশক্তিমান হয়েও যুদ্ধ থামানোর কোনো চূড়ান্ত চেষ্টা করেননি বলে গান্ধারী বিশ্বাস করতেন

গান্ধারীর সেই ভয়াবহ অভিশাপ এবং তার পরবর্তী প্রভাব নিচে আলোচনা করা হলো:

. গান্ধারীর অভিশাপের মূল বক্তব্য

গান্ধারী শ্রীকৃষ্ণকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন:

"তুমি যদি পাণ্ডব কৌরবদের বিবাদ থামাতে চাইতে, তবে তা সম্ভব ছিল। কিন্তু তুমি তা করোনি। তাই আমি অভিশাপ দিচ্ছি যে, আজ থেকে ঠিক ৩৬ বছর পর তোমার নিজের বংশ (যদুবংশ) ঠিক একইভাবে নিজেদের মধ্যে মারামারি করে ধ্বংস হয়ে যাবে। তুমিও নির্জন বনে সাধারণ কোনো উপায়ে প্রাণ হারাবে এবং তোমার বংশের নারীরাও এভাবে প্রিয়জন হারিয়ে বিলাপ করবে।"


. অভিশাপের বাস্তব প্রভাব (যদুবংশ ধ্বংস)

গান্ধারীর অভিশাপের ফলেই দ্বারকায় একের পর এক অমঙ্গলজনক ঘটনা ঘটতে শুরু করে:

  • বিলাসিতা অহংকার: পাণ্ডবদের জয়ের পর যদুবংশীয় বীররা অত্যন্ত শক্তিশালী উদ্ধত হয়ে ওঠেন। তাঁরা ধর্মকর্ম ভুলে বিলাসিতায় মত্ত হন
  • মুষল জন্ম: ঋষিদের সঙ্গে এক তামাশা করার ফলে কৃষ্ণের পুত্র শাম্বর গর্ভ থেকে একটি লৌহ-মুষল জন্ম নেয়। এই মুষলটিই ছিল যদুবংশ ধ্বংসের প্রধান হাতিয়ার
  • ভ্রাতৃঘাতী দাঙ্গা (প্রভাস তীর্থ): অভিশপ্ত ৩৬ বছর পূর্ণ হলে যদুবংশীয়রা প্রভাস তীর্থে ভ্রমণে যান। সেখানে মদ্যপ অবস্থায় তুচ্ছ কারণে নিজেদের মধ্যে বিরোধ বাঁধে। তারা সমুদ্রতীরে জন্মানো 'এরকা' ঘাস (যা আসলে সেই চূর্ণ করা মুষলের অংশ থেকে জন্মেছিল) দিয়ে একে অপরকে প্রহার করতে শুরু করেন এবং একে একে সবাই নিহত হন

. শ্রীকৃষ্ণের দেহত্যাগ

যদুবংশ ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর কৃষ্ণ বুঝতে পারেন তাঁর পৃথিবীতে থাকার সময় শেষ হয়ে এসেছে

  • ব্যাধের বাণ: কৃষ্ণ একটি গাছের নিচে ধ্যানমগ্ন ছিলেন। তখন জরা নামক এক ব্যাধ তাঁর শ্রীচরণকে হরিণের চোখ মনে করে দূর থেকে তীরবিদ্ধ করেন
  • নরলীলার অবসান: এই তীরের আঘাতেই কৃষ্ণ দেহত্যাগ করেন। মজার ব্যাপার হলো, ত্রেতাযুগে রাম রূপে বালীকে বধ করার ফল হিসেবেই দ্বাপর যুগে জরা ব্যাধের হাতে তাঁর মৃত্যু হয় বলে পুরাণে উল্লেখ আছে

. গান্ধারীর অভিশাপ কৃষ্ণ গ্রহণ করেছিলেন কেন?

শ্রীকৃষ্ণ জানতেন যে যদুবংশ অত্যন্ত শক্তিশালী হয়ে উঠেছে এবং তিনি ছাড়া তাদের নিয়ন্ত্রণ করার কেউ নেই। তাঁরা যদি পৃথিবীতে থেকে যেতেন, তবে তারা পৃথিবীর জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াতেন। তাই গান্ধারীর অভিশাপকে তিনি একটি অজুহাত বা মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন যাতে যদুবংশকে বিনাশ করে পৃথিবীর ভার লাঘব করা যায়। কৃষ্ণ হাসিমুখে গান্ধারীর অভিশাপ গ্রহণ করে বলেছিলেন, "মাতা, আপনি যা বললেন তা ঘটবেই, কারণ যদুবংশকে ধ্বংস করার ক্ষমতা অন্য কারো নেই।"


উপসংহার: গান্ধারীর অভিশাপ ছিল মূলত একটি প্রারব্ধ কর্মের ফল এটি প্রমাণ করে যে স্বয়ং ভগবানও যখন মানবরূপে পৃথিবীতে অবতীর্ণ হন, তখন তাঁকে জাগতিক মায়া শাপের বিধান মেনে চলতে হয়

@আব্দুল মুসরেফ খাঁন @কনকপুর 🌐@পাঁশকুড়া।।

📌 সাবস্ক্রাইব করুন: https://www.youtube.com/@bengalibabu2026

📌 ফেসবুক পেজhttps://www.facebook.com/share/1BBtH1yCDF/

📌 ইনস্টাগ্রাম: https://www.instagram.com/author_librarystudy?igsh=MTRoZTYwZ2szcTh0bg==

 


Post a Comment

0 Comments