মহাভারতের বিষাদময় অধ্যায় হলো 'মৌসলপর্ব
মহাভারতের অন্যতম বিষাদময় অধ্যায় হলো 'মৌসলপর্ব'। এই পর্বে যদুবংশের পারস্পরিক কলহ, ধ্বংস এবং শ্রীকৃষ্ণের মহাপ্রয়াণের কাহিনী বর্ণিত হয়েছে। নিচে এই পর্বের মূল ঘটনাগুলো তালিকার মাধ্যমে দেওয়া হলো:
১. ঋষিদের অভিশাপ ও লোহার মুষল
গান্ধারীর অভিশাপ এবং পরবর্তীতে বিশ্বামিত্র, কণ্ব ও নারদ মুনির সাথে যদুবংশীয় যুবকদের পরিহাসের ফলে অভিশাপ নেমে আসে। শাম্ব একটি লোহার মুষল প্রসব করেন, যা যদুবংশ ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
২. অশুভ লক্ষণ ও দ্বারকা ত্যাগ
দ্বারকায় নানাবিধ প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও অমঙ্গল চিহ্ন দেখা দিতে থাকে। শ্রীকৃষ্ণ বুঝতে পারেন যদুবংশের অন্তিম সময় উপস্থিত। তিনি যদুবংশীয়দের পাপমুক্ত হওয়ার জন্য প্রভাস তীর্থে যাওয়ার নির্দেশ দেন।
৩. সুরাপান ও গৃহযুদ্ধ
প্রভাস তীর্থে গিয়ে যদুবংশীয়রা চরম মদ্যপানে মত্ত হয়ে পড়েন। নেশাগ্রস্ত অবস্থায় সাত্যকি ও কৃতবর্মার মধ্যে পুরোনো শত্রুতা (কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের ঘটনা) নিয়ে বিবাদ শুরু হয়। এই বিবাদ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং যদুবংশীয়রা একে অপরকে আক্রমণ করতে শুরু করেন।
৪. যদুবংশের বিনাশ
অভিশপ্ত সেই লোহার মুষলের চূর্ণ থেকে জন্মানো 'এরকা' ঘাস যখনই কেউ হাতে নিচ্ছিলেন, তা বজ্রসম শক্তিশালী মুষলে পরিণত হচ্ছিল। এই অস্ত্রের আঘাতেই নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ করে যদুবংশের প্রায় সকলেই মৃত্যুবরণ করেন।
৫. বলরামের দেহত্যাগ
যদুবংশের ধ্বংস দেখে বলরাম যোগবলে দেহত্যাগ করেন। তাঁর মুখ থেকে এক বিশাল শ্বেতবর্ণের নাগ (অনন্ত নাগ) নির্গত হয়ে সমুদ্রে প্রবেশ করে।
৬. শ্রীকৃষ্ণের তিরোভাব (মহাধ্যান)
একাকী বনে বসে ধ্যানমগ্ন থাকা অবস্থায় জরা নামক এক ব্যাধ শ্রীকৃষ্ণের পা-কে হরিণ মনে করে তির নিক্ষেপ করেন। সেই তীরের আঘাতেই শ্রীকৃষ্ণ মর্ত্যলোক ত্যাগ করেন এবং বৈকুণ্ঠে ফিরে যান।
৭. অর্জুনের আগমন ও দ্বারকা নিমজ্জন
খবর পেয়ে অর্জুন দ্বারকায় আসেন এবং অবশিষ্ট নারী ও শিশুদের নিয়ে হস্তিনাপুরের দিকে রওনা হন। অর্জুন চোখের সামনে দেখেন যে, শ্রীকৃষ্ণহীন শ্রীহীন দ্বারকা নগরী সমুদ্রের তলায় তলিয়ে যাচ্ছে।
৮. অর্জুনের শক্তির হ্রাস
পথিমধ্যে দস্যুরা যখন যদুবংশের নারীদের আক্রমণ করে, তখন অর্জুন লক্ষ্য করেন যে তিনি আর আগের মতো গাণ্ডীব ধনু চালাতে পারছেন না এবং তাঁর দিব্যাস্ত্রগুলো তিনি ভুলে গেছেন। এতে প্রমাণিত হয় যে দ্বাপর যুগের সমাপ্তি এবং কলিযুগের সূচনা হয়েছে।
মৌসলপর্বের এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সম্পর্কে নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. গান্ধারীর অভিশাপ (যদুবংশ ধ্বংসের বীজ)
কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ শেষে যখন পাণ্ডবরা বিজয়ী হন, তখন ধৃতরাষ্ট্র ও গান্ধারী শোকে ব্যাকুল ছিলেন। গান্ধারী তাঁর ১০০ পুত্রের মৃত্যুর জন্য শ্রীকৃষ্ণকে দায়ী করেন। তিনি জানতেন শ্রীকৃষ্ণ ভগবান হয়েও এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ থামাতে পারতেন।
- অভিশাপের প্রেক্ষাপট: যুদ্ধের ছত্রিশ বছর পর গান্ধারী শ্রীকৃষ্ণকে অভিশাপ দেন যে— যেভাবে কুরুবংশ একে অপরকে হত্যা করে ধ্বংস হয়েছে, ঠিক একইভাবে শ্রীকৃষ্ণের বংশ তথা যদুবংশও নিজেদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে ধ্বংস হবে।
- শ্রীকৃষ্ণের প্রতিক্রিয়া: ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এই অভিশাপ শান্ত মনে গ্রহণ করেন এবং মৃদু হেসে বলেন যে, যদুবংশকে ধ্বংস করার ক্ষমতা বাইরের কারও নেই; তারা কেবল নিজেরাই নিজেদের ধ্বংস করতে পারে।
২. অর্জুনের বিষাদ (এক যুগের অবসান)
মৌসলপর্বে অর্জুনের বিষাদ অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী। এটি কেবল প্রিয়জন হারানোর শোক নয়, বরং নিজের বীরত্বের অবসান ঘটার যন্ত্রণা।
- অসহায়ত্ব: যদুবংশের ধ্বংস ও শ্রীকৃষ্ণের দেহত্যাগের খবর পেয়ে অর্জুন দ্বারকায় আসেন। তিনি যখন দ্বারকার অসহায় নারী ও শিশুদের রক্ষা করে নিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন পথে একদল দস্যু তাদের আক্রমণ করে।
- শক্তির লোপ: এক সময়ের অপরাজেয় বীর অর্জুন দেখেন যে, তাঁর সেই বিখ্যাত গাণ্ডীব ধনু তিনি আর টেনে ধরতে পারছেন না। তিনি তাঁর দিব্যাস্ত্রগুলো স্মরণ করার চেষ্টা করেন, কিন্তু কোনো মন্ত্রই তাঁর মনে আসছিল না। দস্যুরা তাঁর চোখের সামনে নারী ও সম্পদ লুণ্ঠন করে নিয়ে যায়, অথচ অর্জুন ছিলেন সম্পূর্ণ অক্ষম।
- উপসংহার: এই ঘটনায় অর্জুন বুঝতে পারেন যে, শ্রীকৃষ্ণের বিদায়ের সাথে সাথে তাঁর সমস্ত দৈব শক্তিও বিলীন হয়ে গেছে। ঋষি ব্যাসদেব তাঁকে বুঝিয়ে বলেন যে— কাল বা সময় অতি শক্তিশালী; সময়ের প্রয়োজনে মানুষ বীর হয়, আবার সময়ের অমোঘ নিয়মে সেই শক্তি একদিন হারিয়ে যায়।
@আব্দুল মুসরেফ খাঁন @কনকপুর 🌐@পাঁশকুড়া।।
📌 সাবস্ক্রাইব করুন: https://www.youtube.com/@bengalibabu2026
📌 ফেসবুক পেজ: https://www.facebook.com/share/1BBtH1yCDF/
📌 ইনস্টাগ্রাম: https://www.instagram.com/author_librarystudy?igsh=MTRoZTYwZ2szcTh0bg==

0 Comments